কাঁপল বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা, বাড়িঘরে ফাটল

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৪৩ এএম

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের নর্থপ্যাড এলাকার আশপাশে কয়েক দফা কম্পনে মাটি কেঁপে ওঠার পর শতাধিক ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। গত শনিবার দিন ও রাতের এ ঘটনায় সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে খননকাজের সময় কর্মীদের অসতর্কতার কারণে ভূ-কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তবে বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটা প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে। আবহাওয়া অফিসও বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। কারণ তাদের তিনটি রাডারের মধ্যে একটি রাডারে ওই কম্পন চিহ্নিত হয়। ফলে এ কম্পনের উৎস প্রাকৃতিক না মানুষ সৃষ্টি তা নিয়ে সন্দিহান আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে রাষ্ট্রায়ত্ত সিলেট গ্যাস ফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানূর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পেট্রোবাংলা। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব বিভাগ) মো. আলমগীর হোসেন ও পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রডাকশন) মো. সালাউদ্দিন।

গতকাল রাত সাড়ে ৭টায় তদন্ত কমিটির প্রধান মিজানুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসেছি। শেভরনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছি। এখানে তারা কী ধরনের কাজ করছে এবং সেটি ওই ভূমিকম্পনের জন্য কতটা দায়ী, তা পুরোপুরি পর্যবেক্ষণের আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন।’

এদিকে ভূকম্পনে অনেকের ঘরবাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় শনিবার রাতে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবি করে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শেভরন বাংলাদেশের মুখপাত্র ও প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ ব্যবস্থাপক শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে আমাদের ড্রিলিং (খনন) কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সুতরাং ড্রিলিং কিংবা সিসমিক সার্ভের কারণে ওই এলাকায় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। অনেকে শেভরনকে দায়ী করলেও এটা ঠিক না। কারণ মাটির নিচে গ্যাসের মজুদ পরীক্ষার জন্য সিসমিক সার্ভে করার আগে আমরা মাইকিং করে এবং নানাভাবে সাধারণ মানুষকে জানিয়ে থাকি। হঠাৎ করে এক্সপ্লোশন করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার কোনো নজির নেই। তাছাড়া এজন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনেরও অনুমোদন নিতে হয়। শেভরন কোনোদিন এ ধরনের কাজ করবে না। আমরা এটার জন্য দায়ী না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এটা প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে। শেভরন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে। জানমালের নিরাপত্তা ও পরিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে, তা মেনে চলে শেভরন।’

স্থানীয় ইনাতগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোমান হোসেন বলেন, দেড় মাস আগে একবার ভূকম্পন হয়। এরপর শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিন দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এতে ইনাতগঞ্জ, দীঘলবাগ ও আউশকান্দি ইউনিয়নের কয়েকশ বাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কয়েকটি গ্রাম জুড়ে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। রাত ১০টার দিকে দীঘলবাগ ও ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের শত শত মানুষ বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের নর্থপ্যাডের সামনে জড়ো হন। তারা ভূকম্পন সৃষ্টির জন্য শেভরনকে দায়ী করে মিছিল বের করেন।

খবর পেয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও নবীগঞ্জ থানার ওসি মাসুক আলী ঘটনাস্থলে যান। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান নোমান হোসেন মোবাইল ফোনে হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়াকে পরিস্থিতির কথা জানান। তখন এমপি কেয়া চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনের লাউডস্পিকার ব্যবহার করে হ্যান্ডমাইকে বিক্ষুব্ধদের শান্ত থাকার অনুরোধ করেন। তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবগত করেছেন এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান। এমপি বলেন, কী কারণে ভূকম্পন হচ্ছে তা তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ড্রিলিং কাজ বন্ধ থাকবে। তার বক্তব্য শোনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী আশ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন।

এমপি কেয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীকে তাৎক্ষণিক অবগত করি। মন্ত্রীর নির্দেশে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র। এটি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ ও দীঘলবাগ ইউনিয়নে অবস্থিত। দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের ৫০ শতাংশই আসে বিবিয়ানা থেকে। এই ক্ষেত্রের ২৬টি কূপের উৎপাদন ক্ষমতা দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে বিবিয়ানা থেকে দিনে ১০৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে শেভরন সরকারের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে। এর আওতায় নতুন কূপ খোঁড়া হচ্ছে বিবিয়ানায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত