১৩৫ দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১০ এএম

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলতি দফার অভিযানের চার মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল বুধবার। এদিনও সেখানকার রাফা অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলায় বহু হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে আছে ছয় ফিলিস্তিনি পুলিশও। গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে উপত্যকাটিতে চলমান ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৭ হাজার ৫৮৫ জন নিহত হয়েছে; যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। মাঝে কয়েক দিনের যুদ্ধবিরতি বাদে প্রতিদিনই সেখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে ইসরায়েলের গোলায়। সম্প্রতি সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিযান বন্ধের দাবি উঠেছে বিশ্বজুড়ে। তবে সংঘাতে জড়ানো দুপক্ষের কেউই এতদিন সে দাবি কানে তোলেনি। অবশ্য ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতা করা কয়েকটি দেশ পক্ষদুটি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কয়েক দিন ধরে আলোচনার পর অবশেষে গাজায় সাড়ে চার মাসের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে হামাস। যে সময়ে ইসরায়েলের বাকি সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ইতি টানতে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আলজাজিরা বলছে, গত সপ্তাহে কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটি প্রস্তাব হামাসের নেতাদের কাছে পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাব হাতে পাওয়ার কথা জানিয়ে তখন হামাসের শীর্ষ এক নেতা জানিয়েছিলেন, তারা প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করে দেখছেন। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই এবার নিজেদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সামনে আনল হামাস।

হামাসের যুদ্ধবিরতির পাল্টা প্রস্তাবের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে ইসরায়েল বারবার বলেছে, গাজায় হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

হামাস যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা দেখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। হামাসের ওই প্রস্তাবে তিনটি পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি পর্যায় ৪৫ দিনের হবে। যুদ্ধবিরতির ওই প্রস্তাবে হামাস বলেছে, ফিলিস্তিনি কারাবন্দিদের বিনিময়ে তারা ইসরায়েল থেকে গত ৭ অক্টোবর ধরে নিয়ে আসা বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেবে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে হবে, ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং উভয়পক্ষ মৃতদেহ এবং বাকি অন্যান্য কিছু বিনিময় করবে।

একটি বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপনীত হতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গত মঙ্গলবার কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতাকারী দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং রাতেই ইসরায়েলে উড়ে যান। বুধবার তার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করে হামাসের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সেই আলোচনার বিস্তারিত জানা যায়নি গতকাল রাতে।

গাজায় যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, হামাস যে পাল্টা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে সেখানে শুরুতেই স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়নি। তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যে যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে আলোচনা করতে হবে এবং জিম্মিদের শেষ দলটি মুক্তি পাওয়ার আগে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে হবে।

রয়টার্সের দেখা নথি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ৪৫ দিনে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের মুক্তির বিনিময়ে হামাসের হাতে বন্দি সব ইসরায়েলি নারী, ১৯ বছরের কম বয়সের পুরুষ, বয়স্ক এবং অসুস্থ জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে। এ ছাড়া, চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ইসরায়েলকে গাজার সব জনবহুল এলাকা থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ত না উভয়পক্ষ ‘পারস্পরিক সামরিক অভিযান শেষ করতে এবং সম্পূর্ণ শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলোর ওপর পরোক্ষ আলোচনার সমাপ্ত না করবে’ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রস্তাবিত চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হবে না।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ইসরায়েলের বাকি সব পুরুষ জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া এবং পুরো গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা বলা আছে।

মৃতদেহ এবং অন্যান্য কিছু প্রস্তাবিত চুক্তির তৃতীয় পর্যায়ে বিনিময় করা হবে। চুক্তিতে গাজায় খাদ্য এবং অন্যান্য ত্রাণসহায়তা বৃদ্ধি কথা বলা হয়েছে। দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে গাজা। সেখানে বেশিরভাগ মানুষ এখন এমনকি দিনে একবেলা খাবারও খেতে পায় না। নিত্যপণ্যেরও চরম সংকট রয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দিলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নয় বলে ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। গতকাল সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, রিয়াদ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের জন্য তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে; যারা ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে রেখে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।

ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর দখল করে। পশ্চিম তীর ও গাজা মিলে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে ফিলিস্তিনিরা।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গাজা স্ট্রিপে ‘ইসরায়েলের আগ্রাসন’ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং ভূখণ্ডটি থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত