পাকিস্তান সমন্ধে একটি কৌতুক প্রচলিত আছে যে, দুনিয়ার সব দেশে একটা করে সেনাবাহিনী থাকলেও শুধু একটা সেনাবাহিনীরই আস্ত একটা দেশ আছে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, ভারতবর্ষ ভাগ করে, মুসলিমদের জন্য একটা দেশ পাওয়া গেল। কিন্তু বছর দশেক পার হতে না হতেই সে দেশের শাসনক্ষমতা পেল সামরিক বাহিনী। এরপর গত ছয় দশকের ওপর হরেদরে সামরিক শাসনের অপচ্ছায়া দেশটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এই সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালি লড়াই করে আলাদা হতে পারলেও, পাকিস্তানের মানুষ এই নাগপাশ সেই অর্থে ছিন্ন করতে পারেনি। দিনকে দিন অর্থনীতি তলিয়েছে, সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিবেশ খারাপ হয়েছে, বিরুদ্ধ মতের মানুষের ওপর অত্যাচার বেড়েছে। মানুষ বারবার লড়াই করেছে, কখনো লড়াইয়ে ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে, কখনো প্রতারিত হয়েছে, কখনোবা দেশি-বিদেশি শক্তির প্রবল ক্ষমতায় নিষ্পেষিত হয়েছে। এহেন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়, পাকিস্তানের জনগণের জন্য হাজির হয়েছে আরও একটি ক্রান্তিলগ্ন২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন। পাকিস্তানের টালমাটাল ইতিহাসের মতোই আরও একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। ইমরান খান, যিনি ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতিয়ে পরিণত হয়েছিলেন দেশটির সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্বে, তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন তেহরিক-ই-ইনসাফ নামের দলটি। ব্যক্তিজীবনে ইউরোপীয় দর্শনে বেড়ে ওঠা, সেকুলার জীবন কাটালেও, রাজনীতির মাঠে তিনি ধর্মকে ব্যবহার করেন এ অঞ্চলের অন্য অনেক রাজনীতিবিদের মতো দক্ষতায়। ক্ষমতায় যেতে সহায়তা নেন পাকিস্তানের হর্তা-কর্তা-বিধাতা সামরিক বাহিনীরও। তবে ইমরানের সঙ্গে সেই সেনাবাহিনীর দূরত্বও তৈরি হয়।
এর ফলে সেনাবাহিনী নানা কায়দায় ইমরানকে ক্ষমতা থেকেই শুধু দূরে রাখে তাই না, তাকে মোটামুটি তুচ্ছ কারণে কারাগারে প্রেরণ করে। বলাইবাহুল্য, ইমরানের প্রতি এতে জনসমর্থন আরও বাড়ে। ইমরানকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করায় ইমরানকে সমর্থন করা প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। সামরিক বাহিনীর নির্দেশনায় দেশটির নির্বাচন কমিশন নানাভাবেই ইমরানকে বাধা দিয়েছেন, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম যাতে নির্বাচনী প্রচারণা করতে না পারে সেই কারণে ইন্টারনেট বন্ধ করাসহ নানা কায়দা নিয়েছে। এসব বাধা ডিঙিয়ে দেশটির জনতা ব্যালটে ও এরপর কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ওপর পাকিস্তান শুধু নয়, উপমহাদেশ, এমনকি বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
সেসবের আগে আমরা পাকিস্তানের রাজনীতিতে অন্য ক্রীড়নকদের অবস্থা একটু বুঝে নিই। মুসলিম লিগের নওয়াজ শরিফ এবার সামরিক সমর্থনপুষ্ট। সামরিক বাহিনীর মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলায় যেই নওয়াজকে উৎখাত করে ইমরানকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৯৯ সালে আরেক সামরিক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ দ্বারা উৎখাত হওয়া নওয়াজ আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হন। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনীতির অনিঃশেষ বাঁক আর চমকের আরেক অধ্যায়ে মুসলিম লিগের এ নেতা এবার সামরিক বাহিনীর পুতুল।
এ নির্বাচনে আরেকপক্ষ পাকিস্তান পিপলস পার্টি। জুলফিকার আলি ভুট্টোর নাতি, বেনজির ভুট্টোর পুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো এখন এই দলের প্রধান। বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় থাকা, একসময়ে পাকিস্তানের বৃহত্তম দলটি ইমরান ও নওয়াজের দলের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়েই আছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণের জটিল হিসাবে এবার দলটি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধাচরণই করছে। যেখানে নওয়াজ ‘একদলীয় গণতন্ত্রের’ আলাপ দিচ্ছেন, সেখানে বিলাওয়াল প্রত্যাখ্যান করছেন এই প্রেসক্রিপশন। তিনি বলেছেন, ‘যেসব দেশের উন্নয়ন পরিসংখ্যান দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে, তথাকথিত একদলীয় গণতন্ত্র ভালো, সেসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সময়টায়। অথচ এই বিলাওয়াল কিছুদিন আগে নওয়াজের দলের সঙ্গে জোট বেঁধে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।
ইমরানের দল নির্বাচন করতে না পারলেও, ইমরানের সমর্থনের প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। এর সঙ্গে যদি পিপিপি যোগ দেয়, তবে ইমরানই শেষতক বিজয়ী হবেন। অবশ্য সেনাবাহিনী সেই বিজয়কে কীভাবে মোকাবিলা করে তা দেখার বিষয়। তবে এ নির্বাচনে এবং এরপর সেনাবাহিনীর আধিপত্যর বিরুদ্ধে জনতা একটা জোর লড়াই করবে এ স্বপ্ন দেখাই যায়। যেরকম লড়াই চলছে এখন মিয়ানমারে। নানারকম গোত্র, আঞ্চলিক শক্তির পাকিস্তানে হয়তো মিয়ানমারের মতো যুদ্ধ হবে না, কিন্তু ব্যালটের পর বুলেটের একটা অধ্যায় হয়তো অপেক্ষা করছে। মনে রাখতে হবে, এ বছরের শেষদিকে ভারতেও নির্বাচন হবে। পাকিস্তানের নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি ভারতের নির্বাচনে বিপুল প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবসময় ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই চুপ করে বসে থাকবে না। কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে আঙ্কেল স্যামের দেশ?
সম্প্রতি পাকিস্তানের ইরান সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপারটা নজরে রাখছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই ঘনিষ্ঠ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং আধিপত্য নিয়ে লড়াইয়ে ক্রমেই দুই বা ততোধিক মেরুতে ভাগ হওয়া দুনিয়ায় পাকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ঘুঁটি। মনে রাখতে হবে, দেশটিতে যত সমস্যাই থাক, এর পারমাণবিক সক্ষমতা বিপজ্জনক। গাজার হত্যাকান্ডে সারা দুনিয়া যখন ক্ষিপ্ত, তখন মুসলিমপ্রধান এই পারমাণবিক শক্তিধর দেশটি আসন্ন অস্থির দুনিয়ায় ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ফলত, পাকিস্তানের নির্বাচন ইতিমধ্যেই আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা দুনিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে এ নির্বাচনের সম্পর্ক কী? দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবেই শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধ ও এর পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জরুরি। আর এ দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও ইমরানের কাছ থেকে শিখতে পারে। জেলে থেকেও উনার নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং জিতে আসার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষা। হয়তো বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের অবস্থা একরকম নয়। কিন্তু একেবারেই কি আকাশপাতাল!
লেখক : সাংবাদিক
