জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সম্প্রতি গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবিতে টানা আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন থেমে নেই সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও। ধর্ষণের ওই ঘটনার পর গতকাল শনিবার সপ্তম দিনেও নিপীড়নবিরোধী সংহতি সমাবেশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’। বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এ সমাবেশ শুরু হয়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।
আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো ধর্ষক ও তাদের সহায়তাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ছাত্রত্ব শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল থেকে সরিয়ে বৈধ শিক্ষার্থীদের আসন নিশ্চিত করা, র্যাগিং সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা, যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জনির বিচার নিষ্পত্তি করাসহ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় নানা অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়কদের সহায়তার অভিযোগ তদন্ত এবং তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক পদ থেকে তাদের অব্যাহতি প্রদান এবং মাদকের সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।
সমাবেশে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি মনে করি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ধর্ষণের ঘটনা অনেক জায়গায় ঘটে, অনেক পরিবেশ পরিস্থিতিতে ঘটে, কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে এবং র্যাবের তদন্তে যা উদঘাটিত হয়েছে, তাতে আমার মনে হয় একটি সিস্টেম এটিকে তৈরি করেছে। এই ধর্ষণ একটি প্রভাব মাত্র। মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন অপকর্মের একটি চক্র এই সিস্টেমের সঙ্গে কাজ করছে। দুর্ভাগ্যের কথা হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই সিস্টেমের একটি অংশ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল থেকে অছাত্রদের বের করার জন্য ৫ কর্মদিবসের সময় নিয়েছিল। সে সময়ের ৪ কর্মদিবস অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাদের কাজ দেখে আমাদের মনে হচ্ছে তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি করতে চান। আমরা আরও এক কর্মদিবস দেখব, আমাদের দাবি না মানা হলে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন জলী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আন্দোলন করছে, তাদের উদ্দেশ্য একটাই, ধর্ষক মোস্তাফিজুর ও তারা সহায়তাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা। আমরা এর আগেও দেখেছি পত্রিকার শিরোনামে ছাত্রলীগ কর্র্তৃক নারী নিপীড়নের খবর। এখনো দেখছি। সময় পাল্টেছে কিন্তু শিরোনাম পাল্টায়নি। যারা ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটায়, তাদের চরিত্র পাল্টায়নি। ছাত্রলীগে অনেক মেধাবী ও সৎ শিক্ষার্থীরাও আসে বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু সংগঠনটি আজও পর্যন্ত কোনো জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, বিপদে পড়েছে তাদের পাশে এই সংগঠনের কেউ দাঁড়ায়নি। বরং তারা বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তাদের সংঘটনকে কলঙ্কিত করেছে। আজকে যারা আন্দোলন করছে তাদের কারও হাতে অস্ত্র নেই, লাঠি নেই। কিন্তু তারপরও তারা এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে ভয় পায়।’
গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে স্বামীকে হলের কক্ষে আটকে রেখে পরে স্ত্রীকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ এক বহিরাগতের বিরুদ্ধে।
