খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটি মৌলিক প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। সত্তর দশকে যেখানে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য, চাল উৎপাদন ছিল ১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন, বর্তমানে তা ৪০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। মাছ, মাংস এবং দুধের উৎপাদনও বেড়েছে কয়েক গুণ। বেড়েছে শাকসবজি এবং ফল-মূলের উৎপাদন। ফলে জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির পরিমাণ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মাথা পিছু ক্যালরি পরিমাণ বর্তমানে ২,৩৯৩ কিলো ক্যালরি প্রতিদিনে।
২.
তবে খাদ্য উৎপাদনে আমাদের প্রভূত উন্নতি সাধিত হলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রায় চার কোটি লোক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন এবং এক কোটি লোক তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শিশু ও মহিলাদের মধ্যে এখনো অপুষ্টির হার অনেক বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় উচ্চতায় ও ওজনে কম এবং ৩৩ শতাংশ শিশুর পুষ্টিহীনতার কারণে বুদ্ধির যথাযথ বিকাশ ঘটেনি। এ ছাড়া বাচ্চা জন্মদানে সক্ষম মহিলাদের ৩৬ শতাংশ এবং ৪২ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, করোনা ভাইরাস মহামারী এবং পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার হার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩.
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা বর্তমানে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে এবং খাদ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশের একটি। মাত্র ১০০,০০০ বর্গকিলোমিটার আবাদি ভূমিতে ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করতে হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং এর জন্য প্রতিবছর অতিরিক্ত ৭.৮ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হবে। খাদ্য উৎপাদনের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেও বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বন্যা ও খড়া কৃষির উৎপাদনে খারাপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে তৃতীয় বৃহত্তম খাদ্য আমদানিকারক দেশ। গম, তেল, দুধ, মসলাসহ অনেক খাদ্যদ্রব্য প্রতিবছর আমদানি করতে হয়। এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় এবং বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
৪.
গত এক বছরের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিভিন্ন চেষ্টা করেও খাদ্যপণ্যের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গত ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল এবং গত বছরের অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশের বেশি। অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন আয়ের লোকজন খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং অনেকে খাদ্যের উচ্চমূল্য বহন করতে না পেরে তুলনামূলকভাবে কম দামের শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করছে। অত্যধিক শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ এবং আমিশ ও ভিটামিন জাতীয় খাদ্যের ঘাটতির কারণে অপুষ্টিসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
৫.
বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা। খাদ্যে ভেজাল, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে খাদ্যের গুণাগুণ পরিবর্তন করা, খাদ্যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা বাংলাদেশে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, খাদ্যবাহিত রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তা ছাড়া বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হচ্ছে না। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে খাদ্যাভ্যাসে ক্রমে পরিবর্তন হচ্ছে। মাথাপিছু শর্করা খাবারের পরিমাণ যদিও বর্তমানে অনেক বেশি, কিন্তু তা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী চালের ব্যবহার গত চার বছরে ১০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে এবং ফলমূল ও মাছ মাংসের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত ক্রমে অধিক পুষ্টিকর খাবার যেমন মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফলমূল, শাকসবজি বেশি গ্রহণ করছে।
স্বাধীনতার পর আমাদের খাদ্যব্যবস্থা জনগণের ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রধান খাদ্যশস্য চাল ও ঘমের উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দেয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের আর্থিক ক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সচেনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। জনগণের এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল রেখে আমাদের খাদ্যব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার ও পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। খাদ্য কেবল ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়, খাদ্য মানুষের সুস্বাস্থ্যের নিয়ামক। খাদ্য ও সুস্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জন্য খাদ্যব্যবস্থায় কেবল অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনে নয়, মনোযোগ দিতে হবে পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে, খাদ্যের মান, গুণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে।
৬.
উপরোক্ত বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্যব্যবস্থা এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনার ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের কৃষি এবং খাদ্যব্যবস্থাকে আরও উৎপাদনশীল, বহুমুখীকরণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বাজার ব্যবস্থার উন্নতি সাধনসহ আরও পুষ্টিনির্ভর এবং স্বাস্থ্যবান্ধব করতে হবে।
প্রথমেই নজর দিতে হবে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশে আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং দিন দিন তা হ্রাস পাচ্ছে। বর্ধিত জনগোষ্ঠীকে এই সীমিত ভূমির মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করতে গেলে আমাদের কৃষির উৎপাদনশীলতা ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে ধানের ফলন বৃদ্ধি পেলেও অন্যান্য ফসল যেমন : ডাল, তেল বীজ, মসলা, দুধ, মাংস এবং পশুজাত খাদ্যদ্রবের উৎপাদনশীলতা অনেক কম। আমাদের কৃষি গবেষণা ধান ও গমের ওপর যথেষ্ট মনোযোগী হলেও অন্যান্য ফসল, ফলমূল এবং মাছ-মাংসের ক্ষেত্রে এখনো কাক্সিক্ষত উন্নতি সাধিত হয়নি।
৭.
বিশেষ করে কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে, যাতে কতিপয় ব্যক্তি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে। কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও গুণগতমান রক্ষার ব্যাপারে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশে কৃষিক্ষেতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণ, মজুদকরণ, বাজারজাত ব্যবস্থাপনায় তেমন উন্নতি সাধিত হয়নি। এর ফলে ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। বিশেষ করে দ্রুত প্রচনশীল কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য যেমন দুধ, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফলমূলের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। যদিও এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পণ্যের প্রকারভেদে পার্থক্য হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ ভাগেরও বেশি।
কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও বহুমুখীকরণে কৃষি গবেষণা এবং কৃষি সম্প্রসারণে আরও জোড় দিতে হবে। বিশেষ করে অপ্রচলিত পণ্য যেমন : ডাল, তেল, বীজ, মসলা, শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষি গবেষণায় আরও মনোযোগী হতে হবে।
সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের খাদ্যাভ্যাস বহুমুখী করতে হবে। সাধারণ জনগণের ক্যালরি প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ভাত থেকে। খাদ্য বহুমুখীকরণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ এবং উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে জনগণের মধ্যে খাদ্যপুষ্টি জ্ঞান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং অপুষ্টিকর ও অধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের নিরুসাহিত করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। দেশে একটি দক্ষ ও কার্যকরি খাদ্যনিরাপত্তা নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
