আইনের সঙ্গে সচেতনতা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৫ পিএম

যৌন হয়রানি বাংলাদেশের সমাজে হয়রানির শিকার হওয়াদের জন্য বিভীষিকা। শুধু যে হয়রানির শিকার হতে হয় তাই না, এই নিয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ আনলে ভয় থাকে যে সমাজ উলটো অভিযোগকারীর চরিত্রকে কলঙ্কিত করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই কারণে যে পরিমাণ যৌন হয়রানি হয় তার অতি সামান্য একটা অংশ নিয়েই অভিযোগ করা হয়।

তবে, এই সংস্কৃতির পরিবর্তন করার দায়িত্ব রাষ্ট্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই সচেতনতা আনতে পারলে পর্যায়ক্রমে সমাজের অন্য স্তরে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সহজ হবে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায়, ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ আবাসিক হলে এক দম্পতির স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন। এই ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গত শতকের শেষ দিকে জাহাঙ্গীরনগরে ধর্ষণ ব্যাপারটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করার পরিপ্রেক্ষিতে জোরদার ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এতদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন গৌরবও ছিল। কিন্তু, সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, এই সংস্কৃতি পুরোপুরি বিনাশ তো হয়ইনি, বরং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

জাহাঙ্গীরনগরের এই প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলেন সেই বিভাগেরই এক ছাত্রী। এরপর অধ্যাপক নাদিরের কক্ষে তালা দেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়া পর্যন্ত সব একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তিনি এক ছাত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন। এই অভিযোগ সিন্ডিকেটে তোলা হয় কিন্তু এই নিয়ে কালক্ষেপণের সুযোগে সেই শিক্ষক বিদেশে চলে যান। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারী সহকর্মী অভিযোগ আনেন পুরুষ এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে। এমনকি ঢাকার কিছু নামজাদা স্কুলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা উপায়ে ছাত্রীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

উচ্চ আদালতের এক নির্দেশনায় প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন নিপীড়নবিরোধী ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করতে হবে যার প্রধান হবেন একজন নারী। কমিটি কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত ও অনুসন্ধান সাপেক্ষে পুলিশের কাছে সাহায্য চাইবে এবং দেশের প্রচলিত আইনে দোষীদের শাস্তি বিধান করা হবে। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান জানান, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই যৌন হয়রানি বিষয়ে সেল থাকলেও সেখানে খুব বেশি অভিযোগ পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রেই ধামাচাপাও দেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আলীমের এক গবেষণায় দেখা গেছে হয়রানির শিকার ৯০ শতাংশই  ন্যায়বিচার না পাওয়া ও চরিত্র হননের ভয়ে সেলে অভিযোগ করেননি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির বিষয়টাকে কঠোরভাবে দেখা হলেই কেবলমাত্র এই গভীর সামাজিক সমস্যাটিকে দূর করা সম্ভব। সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমেও এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, সমাজের চোখে স্পর্শকাতর এই ব্যাপারটিতে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা যাতে নিশ্চিত করা হয়। আমাদের এমন একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যাতে হয়রানিকারীরা কোনোভাবেই ছাড়া না পায় এবং এই জঘন্য অপরাধের জন্য আইনি ও সামাজিকভাবে কঠোর শাস্তি পায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এইসব বিষয়ে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা সচেতনতার কথা বলি কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই নিয়ে আলোচনা স্তিমিত হয়ে গেলে আবারও হয়রানির সংস্কৃতি জেগে ওঠে। এই বিষফোড়া উপড়াতে আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত