হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল

অপ্রয়োজনীয় নিয়োগেই সর্বনাশ 

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৩৪ পিএম

রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স সংকট থাকলেও ৬৫০ জনবলের মধ্যে শুধুমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন ৩৪২ কর্মকর্তা। দায়িত্বরত চিকিৎসকরাই এখান থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসা খরচের তুলনায় সুযোগ সুবিধা সীমিত। বহির্বিভাগে চিকিৎসকরা বসেন নামমাত্র। এই হাসপাতালে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদায়ন সবকিছুই অনিয়মের ঘেরাটোপে বন্দি। চার বছরে বদলী হয়েছেন ৭ জন পরিচালক। হয়েছে কেনাকাটা ও সংস্কারকাজে অনিয়ম। এমনকি রোগীদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

গত সোমবার সকাল ১১টার দিকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ফটকের সামনে চায়ের টং দোকানে গিয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠানটির ১০-১৫ জন কর্মকর্তাকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। প্রায় ৩০ মিনিটের মতো একই জায়গায় তাদের অবস্থান করতে দেখা যায়। হাসপাতালের ভেতরের খালি মাঠসহ অন্য বিভিন্ন স্থানেও কর্মকর্তাদের ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো ধরনের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ে এই কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছেন। হাসপাতালে বর্তমানে যে ৬৫০ জনবল রয়েছে তার মধ্যে ৩৪২ জনই বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যাদের হাসপাতালে কোনো নির্দিষ্ট কাজ নেই, তারা হাসপাতালে আসেন এবং চলে যান। আর কেবল নিয়োগ পেয়েই শেষ নয়, এই কর্মকর্তারা সময়ে সময়ে নিজেদের পদোন্নতিও আদায় করে নিয়েছেন। যা এখন প্রতিষ্ঠানটির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতন দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। 
তবে বিপুল সংখ্যক অপ্রয়োজনীয় জনবল থাকলেও হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন যথাক্রমে মাত্র ১০২ ও ২০৬ জন করে। রোগীদের সেবার জন্য নিয়োজিত এই চিকিৎসক ও নার্সদেরও অনেকে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তাদের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দি ম্যাডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী প্রতি ১০ শয্যার জন্য ৩ জন চিকিৎসক ও ৬ জন নার্সের প্রয়োজন। সে হিসেবে এই হাসপাতালে প্রয়োজন প্রায় ১৬০ চিকিৎসক ও ৩১৮ নার্স। 

বিষয়টি স্বীকারও করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. এস এম হুমায়ুন কবির (অব.)। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকের নির্দিষ্ট কাজ না থাকলেও তাদের বেতন অনেক বেশি। অপরদিকে চিকিৎসক ও নার্সের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এদিকে নানা অব্যবস্থাপনা ও সেবার মান কমে যাওয়ায় রোগীর সংকট দেখা দিয়েছে। এই হাসপাতালে এখন দিনে গড়ে ২০০ জনের কম রোগী ভর্তি থাকেন, ফলে বেশিরভাগ শয্যা ও কেবিন খালি পড়ে থাকে। হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা কার্যক্রম এবং অনুদান থেকে যে টাকা আসে তা দিয়েই বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় ব্যয় মেটাতে হয়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হলেও রেড ক্রিসেন্ট কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত চিকিৎসকরা মেডিকেল কলেজের কোষাগার থেকে বেতন পান। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার, কনসালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয় হাসপাতালের আয় থেকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান পিরোজপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহীদুল হক জামাল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিচয়ে একক ক্ষমতায় হাসপাতালে বিপুলসংখ্যাক জনবল নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে যখন যে সরকার দায়িত্ব পালন করেছে তারাই দলীয় চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। আর এই চেয়ারম্যানরা দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছেন এবং কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কারকাজে হাসপাতালের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাত করেছেন। ২০১৫ সালে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ২৯ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হাসপাতালের সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে যারা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অনেকেই নির্মোহ ছিলেন না। অপ্রয়োজনে নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের সর্বনাশ করেছেন। তাদের বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে হাসপাতালের তহবিল কমতে কমতে প্রায় শূন্য। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কেউ দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়ালেও দায়িত্ব পালন শেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকাও একটা সমস্যা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত