জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ম তামিম। তিনি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ছিলেন। চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট এবং সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজমুল লিখন
দেশ রূপান্তর : দীর্ঘদিন ধরেই দেশে জ্বালানি নিয়ে যে সংকট চলছে তা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তির কোনো উপায় দেখছেন?
ম. তামিম : এই মুহূর্তে একমাত্র উপায় হলো, বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করা। আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য যে কয়লা দরকার সেটা যদি ঠিকমতো আমদানি করা যায়, তাহলে আপাতত পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা নির্ভর করবে সরকারের কাছে কী পরিমাণ ডলার আছে তার ওপর। এছাড়া তো তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই।
দেশ রূপান্তর : জ্বালানি নিয়ে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক কারণে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি। আসলে মূল কী কারণ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ম. তামিম : বৈশ্বিক কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কিছুটা প্রভাব তো পড়ছেই। বিশেষ করে, ২০২২-২০২৩ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে বড় প্রভাব ছিল। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকার তখন এলএনজি আমদানি বন্ধই করে দিল। সুতরাং এই কারণে খুব বেশি যে ইফেক্ট (প্রভাব) পড়েছে তা বলার সুযোগ নেই। কয়েকটা চালান হয়তো আমরা বেশি দামে গ্যাস কিনেছি। কিন্তু গ্যাসের অভাবে আমাদের তো বিদ্যুতের লোডশেডিং করেই চলতে হয়েছে তখন। এখন বিশ্ববাজারে দাম কম হলেও ডলার সংকটের কারণে কিনতে পারছি না। আসলে আমদানিকৃত জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে ব্যয় বাড়বেই। এটা কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তো আমাদেরও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। এখন আবার সেই পুরনো কথা বলতে হয়, জ্বালানি খাতে কেন আমরা এত বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়লাম? সরকার যখন এই সিদ্ধান্ত নেয় তখন বলা হয়েছিল, অর্থনীতি যদি ভালোভাবে রান করে তাহলে আমরা এই বাড়তি দাম সামাল দিতে পারব। কিন্তু অর্থনীতি তো সেভাবে আগায়নি। এখন সেই টাকা জোগান দেওয়ার কোনো উপায় নেই।
দেশ রূপান্তর : দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ কতটুকু রয়েছে?
ম. তামিম : এত স্বল্প সময়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান করে সেই গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব না। এজন্য অন্তত বছর তিনেক সময় দরকার। সরকার যদি এখন থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করে তাহলে ওই সময়ের মধ্যে একটা ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব। পেট্রোবাংলা ৪৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নিলেও গত দুই বছরে মাত্র ৯টি কূপ খনন করতে পেরেছে। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে বাকি কূপ কীভাবে খনন করবে?
দেশ রূপান্তর : চলমান ৪৬টি কূপ খননের পাশাপাশি ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খননের কথা বলছে পেট্রোবাংলা। এগুলোর অবস্থা তাহলে কী হবে?
ম. তামিম : এসব কথা কোথা থেকে কীভাবে বলে তা আল্লাহই ভালো জানেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ১১১ থেকে ১১২টা কূপ খনন করা হয়েছে। আর আগামী ৫ বছরের মধ্যে তারা ১০০টি কূপ খনন করবে। এজন্য যে টাকা দরকার সেটা কোথায় পাবে? একেকটা কূপ যদি নিজেরাও খনন করি তাও তো ১০০ মিলিয়ন দরকার। বিদেশি কোম্পানি করলে ১৫০ মিলিয়ন লাগবে।
দেশ রূপান্তর : খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে সরকারের গাফলতি রয়েছে। আপনি কি এর সঙ্গে একমত?
ম. তামিম : অনুসন্ধানে অবহেলা বা গাফিলতি এটা তো রয়েছেই। পাশাপাশি বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন গ্যাসকূপে যে পরিমাণ গ্যাস মজুদ রয়েছে তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছি না বা করছি না। এতদিন পর এখন বলা হচ্ছে, আরও ১০০টি কূপ খনন করব। এটা তো ১৫-২০ বছর আগে হওয়ার কথা ছিল। সেটা কেন হয়নি? এখন যদি এই ১০০টি কূপ খনন করে সেখানে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে গত ১৫ বছর পরে কেন হচ্ছে? ২০০৮-২০০৯ সালেই তো আমাদের দেশে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়। এখনকার গ্যাসের যে সংকট সেটা তো আগে থেকে প্রেডিক্ট করা। পেট্রোবাংলার নিজস্ব প্রাক্কলনেই তখন এটা বলা হয়েছিল। তাহলে এই উদ্যোগ কেন এত দেরিতে নেওয়া হলো? তার মানে এখন এই উদ্যোগ যদি নেওয়া হয়, তাহলে তো আরও আগেই তখন এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ ছিল।
দেশ রূপান্তর : এখন তাহলে সরকারের করণীয় কী?
ম. তামিম : তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। তবে দেশের পুরো অনশোর এবং অফশোর এই দুটো এলাকায় বহুজাতিক তেল কোম্পানি-আইওসির মাধ্যমে ব্যাপক অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তাতে যদি ভালো অনুসন্ধান হয় তাহলে অনেক গ্যাস পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগে আমাদের প্রথম কাজ হলো, পেট্রোবাংলার অধীনে যে গ্যাস মজুদ রয়েছে সেটাকে উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে। এখন তারা যাই যুক্তি দেখাক না কেন সেটা তারা উত্তোলন করতে পারছে না। আইওসির কাছে মাত্র ১ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাসের মজুদ থেকে প্রতিদিন ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করছে। আর পেট্রোবাংলার ৭-৮ টিসিএফ গ্যাস মজুদ থাকার পরও যেখান থেকে দৈনিক মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা এটা করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ তাদের সেই সক্ষমতা নেই। এই ক্ষেত্রগুলোতে অপারেশনটা তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে করাতে হবে। সেখানে পেট্রোবাংলা, বাপেক্স কিংবা দেশীয় অন্যান্য গ্যাস উত্তোলন কোম্পানির ‘কোলাবরেশন’ থাকতে পারে। কিন্তু এখান থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রক্রিয়া সেটার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কাজটা করতে হবে। সেটা যদি করা যায় তাহলে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়বে এবং এর দাম আমদানিকৃত এলএনজির তুলনায় অনেক অনেক কম হবে।
দেশ রূপান্তর : দেশীয় কয়লা নিয়ে তো অনেকদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আপনার অভিমত।
ম. তামিম : দেশীয় কয়লা তো এখন পর্যন্ত কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগারে)-এ আছে। যদিও এবারের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে এটা অ্যাক্টিভলি দেখা হবে এবং করার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু এটা আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা এখনো এটা নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই দেখিনি আসলে দেশীয় কয়লা উত্তোলন করা যাবে কি না। একটা ‘ওয়াটার স্টাডি’ করা হয়েছিল দেশীয় কোম্পানিকে দিয়ে। সেখানে তারা বেশ কিছু ‘সিনারিওর’ কথা বলেছে। তারা একটা প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আমরা যেটা যাচাই করিনি। সত্যিকার অর্থে একটা নিরপেক্ষ টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন এখনো করা হয়নি। সেই ইভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে যদি জানা যেত দেশীয় কয়লা উত্তোলন করা হলে মারত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হবে। বাংলাদেশের জন্য এবং ওই এলাকার মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হবে। তাহলে সেটা তখন বিবেচনা করা যেত। আসলে ‘ওভারঅল’ কয়লার দূষণের বিষয়টা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ফলে আসলেই কতটুকু ক্ষতি হবে বা হবে না, তা নিয়ে যদি তৃতীয় পক্ষের বিশ^স্ত কোনো প্রতিষ্ঠান মতামত দেয় তখন আর আমরা কয়লা উত্তোলনের কথা চিন্তা করব না। কিন্তু সরকার তো সেটা করেনি।
দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের কথা বলছে সরকার। সাধারণ মানুষের জন্য এটা কতটা সুফল বয়ে আনবে বলে আপনি মনে করেন?
ম. তামিম : প্রাথমিক পর্যায়ে পেট্রোলের দাম সমন্বয় করা যেতে পারে। কিন্তু ডিজেলের ক্ষেত্রে যদি যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠানামার ফর্মুলা প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে ডিজেলের দাম সমন্বয় করা যেতে পারে। তা না হলে ডিজেলের দাম সমন্বয় করে লাভ নেই। কারণ ডিজেলের দাম কমলে যদি ভাড়া না কমে তাহলে বাড়তি টাকাটা তো ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যাবে। সাধারণ মানুষ এর সুবিধা পাবেন না। ব্যবসায়ীদের পকেটে না গিয়ে বরং এই টাকা সরকারের কাছে থাকুক। তাতেও এই টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করতে পারবে সরকার। এতে জনগণ কোনো না কোনোভাবে এর সুবিধা পাবে।
দেশ রূপান্তর : দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার। অনেকেই বলছেন, এ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর অগ্রগতি খুবই সামান্য। আপনার কী মনে হয়?
ম. তামিম : আসলে আমাদের দেশের অবস্থা বিবেচনায় সরকার যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে ৩ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করা সম্ভব খুব সহজেই। কারণ এখানে সরকারের অধিগ্রহণকৃত অনেক জমি রয়েছে। এরমধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্যও অনেক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল যেগুলো বাতিল করা হয়েছে পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনা করে। ওইসব জমিতে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করা সম্ভব আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে। সরকারি এসব জমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলে সেটা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করতে হবে। আনসলিসিটেড প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ প্রতিযোগিতা ছাড়াই কেউ একজন এসে বলল আর তাকে দিয়ে দেওয়া হলো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন, সেটা করলে হবে না।
