ইরান নিয়ে পশ্চিমাদের যত মাথাব্যথা

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১৭ এএম

মধ্যপ্রাচ্য হয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ লোহিত সাগরের বাব এল মান্দেব প্রণালি। ইয়েমেনের হুতিরা সেখানে ইসরায়েল ও পশ্চিমা মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে মুসলিম বিশ্বের জনতার কাছে তুমুল সমর্থন ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে এখন বিমান হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। হুতিরাও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন স্থানে লাখ লাখ ইয়েমেনি জড়ো হয়ে এই হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। সমবেত জনতা ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। হুতি নেতারা জানিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধ না হলে-লোহিত সাগরে তারা হামলা অব্যাহত রাখবেন। কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগই তাদের দমাতে পারবে না। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে বাশার আল আসাদের পক্ষে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহর সদস্যদের সঙ্গেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিপ্লবী গার্ডের অনেক লুকানো এজেন্ট। তাদের সক্রিয় করে এসব দেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনা, কূটনীতিক ও নাগরিকদের হত্যা করতে পারে তেহরান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকাতেও স্লিপার সেল রয়েছে ইরানের। তেহরান থেকে সবুজ সংকেত পেলেই যারা সক্রিয় হয়ে নাটকীয়ভাবে সহিংস হামলা চালাবে।

ডিজিটাল মাধ্যমেও আক্রমণ করতে পারে ইরান। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার স্পেসের জন্য অন্যতম হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ম্যালওয়্যার হামলার সঙ্গেও ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমাদের। মার্কিন সেনারা যদি ইরানে প্রবেশ করে, তাহলে তাদের গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের সম্মুখীন হতে হবে। ইরানের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, মার্কিন সেনাদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাড়ানো। এই লক্ষ্য অর্জনে, ২০২৪ সালকে সুবর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে তেহরান। কারণ, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনবিরোধী জনমত যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ইরানের প্রতি জন-সমর্থন। ইরানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে ইরাকের জোট সরকারে। যারা ইতিমধ্যেই দেশটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রী শিয়া আল-সুদানির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বাইডেন প্রশাসন ইরাক থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলেও জানা গিয়েছিল। যদিও পরে তা অস্বীকার করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যখন উদ্বেগ বেড়েই চলেছে, তখন বিশ্ববাসী সাম্প্রতিক জর্দানে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেন প্রশাসনের জবাবের অপেক্ষা করছে। গত ২৮ জানুয়ারি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনী জর্দানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। এতে তিন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। জানামতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বেশ কয়েকটি পাল্টা হামলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনি এমন এক ব্যবস্থার কথা ভেবেছেন, যাতে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আর না বাড়ে এবং মার্কিন অবস্থানেও যেন আর হামলা না হয়।

বর্তমানে দেশটি ইসরায়েল, আইএস জিহাদি ও পাকিস্তানের মতো বিদেশি ঘটনাগুলোর চক্রে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন হত্যার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দেশটি কেবল নিজেদের পরিস্থিতিই আরও জটিল করে তুলতে পারে। খ্রিস্টানদের বড়দিনে ইসরায়েল দামেস্কের উত্তরাংশে ইরানের সামরিক প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়েছিল। এতে সৈয়দ রেজা মৌসাভি নিহত হন, যিনি ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানির ডান হাত। ২০২০ সালের জানুয়ারির দিকে কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তহত্যার শিকার হন। সোলাইমানির চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালনের ৯ দিন পর ইরানের উত্তরাংশের কেন্দ্রস্থল কারমানে তার কবরস্থানে আইএস দুটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। সোলাইমানি ছিলেন দেশটির জন্য একজন আইকনিক কমান্ডার, যিনি ইরাকে আইএসকে পরাজিত করেছিলেন। এর পরও আইএস তার স্মৃতিসৌধ ধ্বংসের পাশাপাশি ৯১ জন লোক হত্যা করতে সক্ষম হয়। মনে হয়, ওই হামলা বন্ধে দেশটির কোনো শক্তিই ছিল না। ইরানের নেতা ও সেনাবাহিনী বিদেশে তাদের কর্মকর্তা কিংবা দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম ছিল বলে মনে হয়েছিল, তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষকে নেতৃত্ব দেওয়া তো দূরের কথা। তাদের শক্তি প্রদর্শনের দরকার হয়ে পড়েছিল। জানুয়ারির ১৫ তারিখ রেভল্যুশনারি গার্ডস ইরাকের কুর্দিস্তান থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কক্ষ উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এ সময় তারা একজন কোটিপতি ব্যবসায়ীসহ তার পরিবারের সদস্য, অন্যান্য বেসামরিক ব্যক্তি ও এক বছরের কম বয়সী একজন ডাচ শিশুকে হত্যা করে। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের বেলুচিস্তানকে নিশানা বানানো হলো। ইরানের সরকারি গণমাধ্যম ঘোষণা দিয়েছিল, বেলুচের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী জইশ উল-আদলের এক ক্যাম্পে গার্ডস ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।

এক দশকের বেশি সময় ধরে দলটি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত ওই হামলায়ও দুটি শিশু নিহত হয়। তবে এসব প্রদর্শনমূলক ঘটনার ফল উল্টো হয়। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জবাব দিতে গিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের আন্তঃসীমান্তে হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, সন্ত্রাসীদের হত্যা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হয়, অন্তত তিনজন মহিলা ও চারজন শিশু মারা যায়। এদের সবাই ছিল ‘অ-ইরানি’। জানুয়ারির ২০ তারিখ ইরানের গোয়েন্দা কমান্ড সিরিয়ার দক্ষিণ দামেস্কে আঞ্চলিক পরিস্থিতির বিষয়ে বৈঠক করে। তারা আলাপ শেষ করার আগেই ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র তিনতলা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। এতে ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান, ডেপুটি ও রেভল্যুশনারি গার্ডের তিন সদস্য নিহত হন।

ইরানের জনসাধারণ হামাসের প্রতি সরকারি সমর্থনে খুব কমই উৎসাহ দেখিয়েছে। তা ছাড়া ৭ অক্টোবর থেকে বড় কোনো মিছিলও লক্ষ্য করা যায়নি। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সরকারের দমনপীড়নের ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশ সরকারের কাছ থেকে দূরে চলে যায়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নারী, জীবন ও স্বাধীনতার ওপর নিষ্ঠুর আগ্রাসনের প্রতিবাদে জনসাধারণ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। আসন্ন নির্বাচন মাথায় রেখে ক্ষমতার লাগাম কট্টরপন্থিদের হাতে নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানিসহ আরও হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়েছে। তেহরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনে লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা বিশ্ববাণিজ্যের ১২ শতাংশ জোগান দেয়। এদিকে হিজবুল্লাহ প্রতিদিন ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব এক অপকর্মের ফাঁদে পড়েছে। যদি তারা মিত্র গোষ্ঠীর স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরাসরি অভিযান থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তাহলে সে অঞ্চলটিতে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলে পরিচিত হবে। যদি রেভল্যুশনারি গার্ডস আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা করে, তাহলে পাল্টা প্রতিশোধের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি পরাজিতও হতে পারে। সেটা পাকিস্তান কিংবা ইসরায়েল থেকে আসতে পারে। সুতরাং সিরিয়া ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিছক ইরানের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তাদের বলির পাঁঠাও বলা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জবাব নিয়ে হিসাব কষছে। তবে চূড়ান্ত বাণী আসতে পারে ইরানবাসীদের কাছ থেকে, যাদের প্রধান উদ্বেগ দেশ নিয়ে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী গণবিক্ষোভের মধ্যেই চিৎকার করে বলেছিল গাজা কিংবা লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য। তবে সর্বাত্মক যুদ্ধ নাকি সীমিত পাল্টা-হামলা, যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে হাঁটবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে যে কোনো ধরনের সংঘাতই হোক না কেন, তারপর পরিণতি কী হবে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে এতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে। রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে ধ্বংস করার ভয়াল পরিণাম বহু যুগ ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বকে বয়ে বেড়াতে হবে। দেখা দিতে পারে চরম মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থীর ঢল। সর্বোপরি, আমেরিকার ঢালাও আগ্রাসন ইরানকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে, যে পরিণতি ওয়াশিংটন আরও অনেক দেশে তৈরি করেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া রাজনীতির সমীকরণ সেনা প্রত্যাহারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলার সময় আসেনি। বিশেষত, যখন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট উভয় দলই ইসরায়েলকে রক্ষা করাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। বরং ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতেই রাজনীতিবিদরা একাট্টা হবেন এমন সম্ভাবনাই তীব্র। জর্দানে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন রাজনীতিবিদরা এখন ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত হামলার আহ্বান জানাচ্ছেন। এই অবস্থায়, প্রেসিডেন্ট বাইডেন যদি সরাসরি ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আঞ্চলিক শক্তিটির সঙ্গে বৈশি^ক পরাশক্তির যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে অবধারিত। মধ্যপ্রাচ্যে স্নায়ুযুদ্ধের খোলস ছেড়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাহলে বিশ্বের ব্যস্ততম নৌপথে তারই বা কী প্রভাব পড়বে? এর পরিণাম কি শুভ হবে বিশ্বের জন্য?

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত