আমাদের দেশে অদ্ভুত এক নিয়ম চলছে। প্রথমে একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়। এরপর সেটি অনুমোদিত হয় একনেক বৈঠকে। তখন প্রকল্পের বাজেট থাকে সন্তোষজনক। এরপর সেটি পাস হলেই স্বরূপে আবির্ভূত হন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কালক্ষেপণ করে। উত্থাপন করে জটিল কিছু সমস্যা। তখন যৌক্তিক বিবেচনায় বাড়ানো হয় সময়। একইসঙ্গে বাড়তে থাকে প্রকল্প ব্যয়। আবার তৈরি হয় বাজেট। মোট বাজেটের চার ভাগের এক ভাগ বা আরও বেশি অর্থ পাওয়ার পর, কাজের গতি মন্থর হয়ে আসে। এটা দেশি বা বিদেশি যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই করুক না কেন। এখানেই শেষ নয়। নির্দিষ্ট তারিখেও কোনো প্রকল্প শুরু হয় না। আবারও বাড়তে থাকে সময় এবং অর্থ। এই ধরনের দুর্নীতির ধারাপাতে অনেকটাই যেন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মনে হয়, সবকিছুই স্বাভাবিক। যেমন হচ্ছে, খুলনা-মোংলা রেলপথ নিয়ে।
৯১ কিলোমিটারের এই রেলপথ গত বছরের পহেলা নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এ বছরের পহেলা জানুয়াারি থেকে ট্রেন চলাচলের কথা ছিল। তবে ৩ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে রেলপথ। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘জটে খুলনা-মোংলা রেলপথ’ প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। জমি অধিগ্রহণ, রেললাইন ও রেলসেতু নির্মাণসহ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ২০২১ সালে আবার সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। তখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। পরে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ করা হয়েছে।
ট্রানজিট সুবিধার আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহন সহজ করতে ২০১০ সালে খুলনার ফুলতলা রেলস্টেশন থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ স্থাপন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ভারত সরকারের ঋণ সহায়তায় কনসেশনাল লাইন অব ক্রেডিটের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লার্সেন অ্যান্ড টার্বো ও ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। এই রেলপথের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের পণ্য একদিকে যেমন দেশের মধ্যে কম খরচে পরিবহন করা যাবে- অন্যদিকে ভারত, নেপাল ও ভুটানও এটি ব্যবহার করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করবে। ফলে দক্ষিণের অর্থনীতির অগ্রগতিতে রেলপথটি বেশ ভূমিকা রাখবে।
মোংলা বন্দরের কাছে খুলনা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্পনগরী। পাশের দুই জেলায় বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর রয়েছে। ধীরে ধীরে যশোরের বেনাপোল থেকে খুলনা হয়ে মোংলা পর্যন্ত একাধারে শিল্পনগরীতে পরিণত হবে। ভৌগোলিক দিক থেকে দেশের সব থেকে বড় ‘অর্থনৈতিক হাব’ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এই অঞ্চলের। তবে পরিবহন পথ সুগম না হওয়ায় এতদিনেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত বছর পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় রাজধানীর সঙ্গে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার রেল সংযোগ হচ্ছে, ফলে পরিবহন জটিলতা আর থাকছে না।
অনেকেই ভেবেছিলেন- ট্রানজিট সুবিধার আওতায় মোংলা বন্দর থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। রেলপথ উদ্বোধনের পর এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অগ্রগতি বাড়বে। সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। বিকাশ ঘটবে সুন্দরবনের পর্যটনশিল্পের। বাড়বে সরকারি রাজস্ব। রেলপথে পণ্য পরিবহনে কমবে খরচ। মনে হচ্ছে, সবই আজ কথার কথা। প্রকৃত তথ্য আসলে, কোন কর্তৃপক্ষ জানেন?
