শিল্পী বক্স অফিসের জন্য ছবি করে না

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩৯ পিএম

নিরানব্বইতে দেশের স্ক্রিনে প্রথম নাম উঠেছিল নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর। এরপর পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ, অনেকটা আকাশ। সীমান্ত পেরিয়ে ছুটে যেতে যেতে স্পর্শ করেছেন পঁচিশ। পার করতে চলেছেন আরেকটা প্রজন্ম। ব্যাচেলর, টেলিভিশন, শনিবার বিকেলসহ তার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১০টি। করেছেন টিভি মুভি, নাটক, ধারাবাহিক, বিজ্ঞাপন। লিখেছেন গল্প, স্ক্রিপ্ট, লিরিক-কবিতাও। করেছেন অভিনয়ও। বিশেষ সাক্ষাৎকারে তার মুখোমুখি নাজমুস সাকিব রহমান।

নির্মাতা হয়ে ২৫ বছর

যখন নিজের কাজ নিয়ে কথা বলিযে ফিডব্যাক আসে তখন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমার মনে হয় না, আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। মনে হয় অন্যের কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। যেন আমার জীবন না অন্য কোনো মানুষের জীবন বা কাজ নিয়ে কথা বলছি। কেন তার কারণ জানি না। একটা কারণ হতে পারে আমি এত বেশি সামনের দিকে তাকাই, এত বেশি আমার চোখ সামনে থাকে পেছনে কী করছি তার রি-ভিজিট করার সময় পাই না। আমার অবস্থা হয়েছে এ রকম। আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম কোনো একসময়। আমার সামনে একেকটা দেয়াল আছে। আমি ওই দেয়ালটা পার হই। সামনের দিকে দেখি আরেকটা দেয়াল। নজর থাকে ওই দেয়ালটা কিভাবে পার হব। পেছনের কাজ নিয়ে ভাবি না। আমরা ফিল্মকে কুটির শিল্প হিসেবে দেখতাম। আমরা যখন ফিল্ম বানানো শুরু করি তখন আমাদের দর্শক কম ছিল। তখন বাজারে যেসব সিনেমা চলত আমি তাদের একজন হতে পারতাম। কিন্তু আমার কাছে সেটা ম্যাটার করেনি। বোধ হয় ঘোরের মধ্যে ছিলাম। যে কথা বলতে চেয়েছি, যে ভালনারেবিলিটি দেখাতে চেয়েছি, ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই দেখাতে পেরেছি। পপুলার হওয়ার দায় ছিল না। ৩০ লাখ মানুষকে সিনেমা দেখতে হবে এ দায় ছিল না।

অডিয়েন্স তৈরি ও এগিয়ে যাওয়া

আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। গল্পগুলো তাদের স্পর্শ করতে পেরেছে। তারা হয়তো আমার গল্পগুলোর মধ্যে তাদের জীবনটা খুঁজে পেয়েছে। তাই কাজগুলোর সময় আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা একটা সৌভাগ্য বটে। কিন্তু ধরা যাক আমার কাজ একজন মানুষের ভালো লাগত; তা-ও কি আমি ছবি বানাতাম? ফিল্মমেকার কেন ছবি বানায়? কবি কেন কবিতা লেখে? ওটিটিতে সিনেমা বানালে অনেক টাকা পাবে এটার জন্যই কি বানায়? বা তালি দেবে এজন্য বানায়?

শিল্পী আসলে ছবি বানায়, বাঁশি বাজায়, ছবি আঁকে, কবিতা লিখে; হ্যাঁ, এগুলোর মাধ্যমে দর্শকদের সঙ্গে কমিউনিকেট করে। কিন্তু প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে মনের অসুখ সারানো। আমি যে অডিয়েন্স পেয়েছি সেটার জন্য সৌভাগ্যবান। কিন্তু শিল্পী তো বক্স অফিসের দিকে তাকিয়ে ছবি নির্মাণ করে না।

ডেব্যু ‘ব্যাচেলর’ ও পরবর্তী উল্টো পথ

আমি ২০০২ সালে ব্যাচেলরের শুটিং করি। এখনো বিভিন্ন প্রোডাকশনে ব্যাচেলরের ছাপ দেখতে পাবেন। ২০০৩-এ ব্যাচেলর রিলিজ করি, আমাদের অবাক করে দিয়ে টিভিতে রিলিজ করে দেওয়ার পরও বক্স অফিসে দারুণ ব্যবসা করেছে এই ছবি। স্বাভাবিকভাবে একই ঘরানার ছবি বানালে ওইটা তো বক্স অফিসে চলার কথা। কিন্তু আমি উল্টো রাস্তায় হেঁটেছি। যেমন আমি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ (২০০৭) বানিয়েছি, যেটা ওই মুহূর্তে বাজে ব্যবসা করেছে।

স্ক্রিপ্ট ও স্ক্রিন রাইটিং নিয়ে

আমরা মূলত অতর ফিল্মমেকিং করতে আসছি। অথর ফিল্মমেকার তার প্রয়োজনে অনেক ডিপার্টমেন্টের মানুষের সাহায্য নেয়। কেউ সিনেমাটোগ্রাফি করে, কেউ এডিটিং করে, কেউ মিউজিক করে। আবার কেউ হয়তো তার হয়ে স্ক্রিন রাইটিং করে দেয়। যখন স্ক্রিনরাইটিং করতাম তখন আমি বলতাম কী চাই, কীভাবে চাই। আমি এডিটরকেও বলি, সিনেমাটোগ্রাফারকে বলি। ফিল্মমেকার আসলে প্রিভিলেজড মানুষ। আমি আমার স্ক্রিপ্টে সবসময় ইনভলভড থাকতাম। লোকেশনে ইমপ্রোভাইস করতাম। প্রচুর লেখা থাকত। ওই লেখাটা আরও ইমপ্রোভাইস করতে গিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতাম। আমার রাইটিং কাগজে-কলমে না হলেও ইনস্ট্যান্ট চলত ওখানে। তবে রাইটিংয়ের মধ্যে আমি ছিলাম। একটা পর্যায়ে গিয়ে আমি ‘টেলিভিশন’ থেকে কো-রাইট শুরু করি।

চরিত্রের দ্বন্দ্ব

আমি যে জীবনটা যাপন করছি বা আশপাশের যে জীবন দেখি এটা নিয়ে প্রশ্নের উদয় হয় আমার মনে। বোঝাতে চাই কোনটা কে? বুঝতে চাই। বুঝতে চাওয়ার প্রচেষ্টাই আমার সিনেমা। এই যে বুঝতে চাই, চাইতে গিয়ে বাস্তবতা কিন্তু আমাদের দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। বাস্তব জীবনে সব কিছুর উত্তর পাই না। বাস্তবতা কখনো কখনো ভালনারেবল মোমেন্ট এনে ক্রিয়েট করে।

আমি ভালনারেবল মোমেন্ট স্ক্রিনে দেখিয়েছি। অ্যাজ এ ফিল্মমেকার আমার কাজ এই জীবনটা বুঝতে চাওয়া। এই বুঝতে গিয়ে, জীবনটা দেখাতে গিয়ে কখনো আমি নিজে দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। সো দর্শকদেরও দ্বন্দ্ব ফেলতে চাই। কারণ এইটা জীবন বোঝানোর প্রক্রিয়া। জীবন বোঝার প্রক্রিয়ায় সাফল্য আছে। ফলে এটা ডিনাই করতে পারছি না।

সমালোচনা বলতে যা হচ্ছে

একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকে তখন একটা টেন্ডেন্সি থাকে তাকে বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া। আমি ২০০৭ থেকে বহুবার বাতিল হয়েছি। আমি যখন থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার করি ওইটা যখন রিলিজ হয়; তখন বেশিরভাগ পত্রিকায় অনেকে রিভিউ লিখে বলেছিল, উনি ফুরিয়ে গেছে, উনাকে দিয়ে হবে না, উনি বাতিল। তারপর যখন আমি টিকে গেছি তখন আর চেষ্টা করা হয় না। তখন ওরা বুঝতে পারে এই সিন্দাবাদের ভূত মাথা থেকে যাবে না। এখন সমালোচনা হচ্ছে আপনার কাছে ‘৪২০’ বা ‘ব্যাচেলর’ এই টাইপের হিউমারগুলো আর দেখছি না। আরেকটা সমালোচনা আছে আপনি ইদানীং ফেস্টিভ্যালের জন্য কাজ করেন। বাস্তবে ফেস্টিভ্যালের জন্য কিছু করা যায় না। আমার বিপদটা হচ্ছে আমাকে এইদিকে শুনতে হয় আপনি ফেস্টিভ্যালের জন্য কাজ করেন। ফেস্টিভ্যাল বলতে মনে করে ইউরোপের জন্য কাজ করি। আর ইউরোপ বলে ইউ আর টু বাংলাদেশি। আমি আসলে কোনোটাই হইনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত