সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে রেকর্ড ৫ লাখ শূন্যপদ

  • ভোটের ফাঁদে বিসিএস রোডম্যাপ
  • ৯ মার্চ প্রিলিমিনারির তারিখ নির্ধারণ করেছিল পিএসসি
  • একই দিনে হবে ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচন
  • প্রিলিমিনারির পরিবর্তিত তারিখ হতে পারে ২৬ এপ্রিল
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৪৩ এএম

দেশজুড়ে বেকারদের হাহাকার। প্রথম শ্রেণির তো দূরে থাক, নিচের দিকের একটি পদেও চাকরি পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা। এটা একদিকের চিত্র। অন্যদিকের চিত্র হচ্ছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে শূন্যপদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে তা পূরণ করার সংস্থান নেই। যদিও এ সংখ্যা দিয়ে বেকার সমস্যার গভীরতার তল পাওয়া যায় না। চাকরি নেই তো পকেটে টাকাও নেই, গুরুত্বহীন হয়ে যেতে হয় জীবন-সংসারে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বছরে একটি বিসিএস শেষ করার ঘোষণা ছিল চমকপ্রদ। কারণ এখনো একটি বিসিএস আয়োজনে লেগে যায় তিন বছর। কিছুদিন আগে সেটা চার বছরে পৌঁছে ছিল। এরই মধ্যে ফি বছর একটি করে বিসিএসের ঘোষণা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও বেকারদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। এ ক্ষেত্রে বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছিলেন পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন।

কিন্তু বছরে একটি বিসিএস শেষ করার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলেন না তিনি। পুরো বিষয়টি শুরুতেই হোঁচট খেল। শুরু বলতে প্রিলিমিনারিতে। পিএসসি ঠিক করেছিল ৪৬তম বিসিএস এর সব ধাপের কার্যক্রম এক বছরে শেষ করবে। সে অনুযায়ী রোডম্যাপও করা হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ মার্চ। কিন্তু বাদ সাধল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারা ওই তারিখে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণের তফসিল ঘোষণা করেছে। ভোটের দিন তো আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা  হতে পারে না।

বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি চালাচালি হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছে যেন বেকারদের জন্য বিসিএস পরীক্ষা নেওয়ার চেয়ে ‘রাজনৈতিক উত্তাপহীন’ ভোট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই চিঠি চালাচালি কোনো ফল দেয়নি। বাধ্য হয়ে নিজেদের শিডিউল থেকে সরে যাচ্ছে পিএসসি। কারণ একটা বিভাগীয় শহর বাইরে রেখে তো আর বিসিএসের মতো পরীক্ষা হতে পারে না। বিভাগীয় শহরে ওই বিভাগের সব পরীক্ষার্থীর কেন্দ্র পড়ে। ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুর এই চার জেলার সব প্রার্থীর পরীক্ষার সিট অন্য বিভাগে সরিয়ে নেওয়াটাও সময়সাপেক্ষ বিষয়।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২৬ এপ্রিল শুক্রবার বা ২৭ এপ্রিল শনিবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নিতে চায় পিএসসি। বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আজ রবিবার সভা বসছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির। সেখানেই চূড়ান্ত হবে পরীক্ষার দিন।

এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেষ্টা করেছি এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করতে। কিন্তু পারিনি। এতে আমি হতাশ নই। কারণ প্রচেষ্টা শুরু যেহেতু হয়েছে, তা একদিন না একদিন হবেই। যে রোডম্যাপ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী ১২ মাসেই বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সুপারিশ পর্যন্ত সব কাজ শেষ করা যাবে।’

কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, মার্চেই প্রিলিমিনারি নিতে চেয়েছিল পিএসসি। ৯ মার্চ না হলে এক সপ্তাহ পরে ১৬ মার্চ হতে পারত বা অন্য যেকোনো ছুটির দিন পরীক্ষার আয়োজন করা যেত। কিন্তু ১২ মার্চ রোজা শুরু হয়ে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে (চাঁদ দেখা সাপেক্ষে)। এ সময় ইচ্ছা করলেই পরীক্ষা নেওয়া যেত। আরও কিছু সংস্থা এ সময়ে পরীক্ষার শিডিউল রেখেছে। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নানা চিন্তা করে প্রিলিমিনারির তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিএসসি। এই পিছিয়ে দেওয়ার কারণে সোহরাব হোসাইনের মেয়াদকালে আর এক বছরে বিসিএস শেষ করা সম্ভব হবে না। কারণ সোহরাব হোসাইন আগামী বছরের ২০ সেপ্টেম্বর অবসরে যাবেন।

এক বছরে বিসিএস শেষ করার রোডম্যাপ অনুযায়ী ৯ মার্চ প্রিলিমিনারি নেওয়ার পর লিখিত পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়নে সময় রাখা হয় ৬ মাস। সে হিসেবে খাতা মূল্যায়ন শেষ হতো সেপ্টেম্বরে। এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল তৈরির প্রস্তুতি ছিল পিএসসির। সব শেষ করে ৩১ ডিসেম্বর চূড়ান্ত সুপারিশ করার শিডিউল ছিল।

এক বছরে বিসিএস আয়োজনের চেষ্টা ব্যর্থ হলো কেন জানতে চাইলে পরীক্ষা আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু নির্বাচন কমিশনের ভোটই একমাত্র কারণ নয়। পিএসসি চেয়েছিল চলমান বিসিএসগুলো শেষ করে তারপর ৪৬তম বিসিএস থেকে সব বিসিএস এক বছরে শেষ করতে। ওই চলমান বিসিএস শেষ করতে গিয়েই ঝামেলা হয়েছে। ৪৬তম বিসিএস যেহেতু এক বছরে শেষ করার রোডম্যাপ করা হয়েছিল, তাই ওটাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু চলমান পরীক্ষাগুলোতে সমান গুরুত্ব দিতে গিয়ে ৪৬-এর লক্ষ্যমাত্রা থেকে ছিটকে গেছে পিএসসি।’

গত বছরের ৩০ নভেম্বর ৪৬তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ১০ ডিসেম্বর শুরু হয়ে আবেদন প্রক্রিয়া চলে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই বিসিএসে ৩ হাজার ১৪০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ৩ লাখ ৩৮ হাজার চাকরিপ্রত্যাশী।

পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বেকারের এ দেশে অবশ্যই এক বছরে বিসিএস শেষ করা উচিত। কিন্তু এটা করতে গেলে বিসিএসে কিছু সংস্কার আনতে হবে। তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ প্রার্থী প্রিলিমিনারিতে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। এটা কমাতে হবে। আবেদনের যোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়ে এখানে রাশ টানতে হবে। এখানে এক লাখের বেশি প্রার্থী করা যাবে না। একটা বড় অংশ পরীক্ষাতেই হাজির হয় না। আর একটা অংশ পরীক্ষার হলে আসে জীবনে একবার অন্তত বিসিএস দিয়েছি এটা বলার জন্য। পরীক্ষা দিতে না এলেও আমাদের প্রশ্নপত্র ছাপাতে হয়, পরীক্ষার হল সাজাতে হয়, প্রশ্নপত্র পাঠাতে হয়। কিন্তু আবেদন করার যোগ্যতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এত সহজে নেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে একটা শ্রেণি রাস্তায় নেমে আসবে। তখন কাজকর্ম বাদ দিয়ে আইন-আদালতে ব্যস্ত থাকতে হবে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত জুনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৫ লাখ ৩ হাজার ৩৩৩টি পদ শূন্য ছিল।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত এত পদ শূন্য থাকে না। শূন্যপদের সংখ্যা সব সময়ই চার লাখের নিচে ছিল। শূন্যপদের মধ্যে প্রথম শ্রেণি হিসেবে পরিচিত প্রথম থেকে নবম গ্রেডের পদ শূন্য প্রায় ৬৫ হাজার। আর দশম থেকে ১২তম গ্রেডে শূন্যপদ ৯৭ হাজার। বাকি শূন্যপদগুলো অন্যান্য গ্রেডের।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শূন্যপদ পূরণের ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে। কারণ করোনাকালে নিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরও সেই স্থবিরতা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সরকার।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের শূন্যপদ পূরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। শূন্যপদ পূরণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে অনেক নতুন পদ সৃজন হয়েছে। নতুন পদে জনবল নিয়োগে কিছুটা সময় লাগে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশে বেকার ছিলেন ২৪ লাখ ৭০ হাজার। আগের বছর যা ছিল ২৫ লাখ ৮০ হাজার। তবে, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিবিএসের এ তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের মতে, বিবিএসের বেকারের সংজ্ঞায় সমস্যা আছে। তা ছাড়া ডলার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ঋণ সুবিধাও কমে গেছে। দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে, সংকুচিত হয়েছে ব্যবসা সম্প্রসারণ। এমন সংকটে দেশের বেশিরভাগ কোম্পানিকে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে আনতে হয়েছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা কর্মী ছাঁটাইয়ে মনোযোগী। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বেকার বেড়ে যাওয়ার কথা।

অবশ্য জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু পরিসংখ্যানে বন্দি থাকলে কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। দেশের মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যথাযথ কাজের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, সেই কাজের বিনিময়ে সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী প্রাপ্য তাদের মিলছে কি না, তাদের কাজের সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ আছে কি না এসব তথ্য জানা অপরিহার্য। অথচ শূন্যপদে জনবল নিয়োগের আলোচনায় এসব বিষয় কার্যত অনুপস্থিত থাকে। আর এই অনুপস্থিতি কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত আলোচনার গভীরে যেতে দেয় না। তাই কর্মসংস্থান বাড়াতে এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত