ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর মাজহারুল কবির শয়নকে সভাপতি ও তানভীর হাসান সৈকতকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণার ১৪ মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেল ঢাবি ছাত্রলীগ। এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ২৭৯ জন নেতাকর্মী। তবে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুসারে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে এ কমিটির মেয়াদ। ফলে নতুন পদ পেলেও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছেন এসব নেতা। এ ছাড়া এ কমিটিতে বিতর্কিত, বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তদের পদায়ন করায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণায় দেরি করিনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। দেরিতে হলে প্রথা অনুসারে কেন্দ্রের সঙ্গে মিল রেখে কমিটিগুলোর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। তাই মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও এই কমিটির কার্যকারিতা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিলে যেকোনো সময় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে।’
কমিটিতে অপরাধীদের স্থান দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংগঠনের প্রতি ত্যাগ-তিতিক্ষা, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডসহ সবকিছু বিবেচনা করেই আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছি। প্রমাণিত অপরাধী কিংবা বর্তমানে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত আছে এমন কাউকে আমরা পদ দিইনি। যতটুকু সম্ভব কমিটিতে আমরা স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি।’
গতকাল সোমবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটির ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত কমিটিতে সহসভাপতি পদে ৬১, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ১১, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ১১ এবং অন্যান্য সম্পাদকীয় পদে ৩৬ জন পদ পেয়েছেন। এ ছাড়া উপসম্পাদক পদে ১৩৭, সহসম্পাদক পদে ১০ এবং সদস্য পদে ১১ জন পদ পেয়েছেন।
কমিটির নাম ঘোষণা করার পরপরই আলোচনায় উঠে এসেছে কয়েকজন বিতর্কিত নেতার নাম। যারা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত এবং অনেকে বহিষ্কৃতও হয়েছিলেন। তাদের আবার পুরস্কার হিসেবে কমিটিতে পদায়ন করায় তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। এ ছাড়া অনেকে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি না করেও পদ পেয়েছেন বলে জানা যায়। আর কেউ সক্রিয় রাজনীতি করেও বঞ্চিত হয়েছেন।
২০২১ সালে বার্ন ইনস্টিটিউটের ওয়ার্ডবয়কে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদার জন্য মারধর; ক্যাম্পাসে মাদকের সিন্ডিকেট, উদ্যানে গাঁজা-মাদক বিক্রি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন আকতারুল করিম রুবেল। খেটেছেন জেলও। ১৮ ফেব্রুয়ারি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে গতকাল ঘোষিত কমিটিতে সহসভাপতি করা হয়েছে। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে শিবির সন্দেহে এক শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় জেরা ও রাতভর নির্যাতনের অভিযোগে বহিষ্কৃত হওয়া ইউসুফ তুহিন পেয়েছেন কর্মসূচি ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদকের পদ এবং একই ঘটনায় অভিযুক্ত বায়েজিদ বোস্তামী পেয়েছেন উপ-অর্থবিষয়ক সম্পাদকের পদ।
৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের ভ্রাম্যমাণ দোকানমালিকের থেকে চাঁদা চাওয়ার অডিও ক্লিপ ফাঁস হয় তানভীর হোসেন শান্তর। ঘোষিত কমিটিতে তিনি পেয়েছেন নাট্য ও বিতর্ক সম্পাদকের পদ। সহসভাপতি হিসেবে আছে নূর উদ্দীন আহমেদের নাম। তিনি ছিনতাইয়ের অভিযোগে শাহবাগ থানা-পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের ছয়টি দোকান থেকে জোর করে প্রায় অর্ধ লাখ টাকার জামা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত মো. শান্ত আলম সভাপতি পদ পেয়েছেন এবং পরিবেশ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন আব্দুল মমিন। কৃষিশিক্ষা সম্পাদক এমদাদুল হক বাঁধন ২০২২ সালে ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলের গেস্টরুমে ছাত্র পিটিয়ে শিরোনামে এসেছিলেন। স্কুল ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শিবলী সাদিক গত বছর সাংবাদিক লাঞ্ছিত করে আলোচনায় আসেন।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে তুচ্ছ ঘটনায় জগন্নাথ হলে নিলয় কুমার বিশ্বাস নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে সুস্ময় দাসের বিরুদ্ধে। তিনি পেয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ। ফজলুল হক মুসলিম হলের সিট দখল নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে জড়িয়ে বহিষ্কার হয়েছিলেন জিহাদুল ইসলাম, তাকে উপতথ্য ও গবেষণা সম্পাদক করা হয়েছে। গত বছরের ৬ আগস্ট মেডিকেল মোড়ে দোকানে চাঁদাবাজি এবং দোকান কর্মচারীকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তুলে নিয়ে মারধর, হুমকি ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ রয়েছে বেলায়েত হোসেন রকির বিরুদ্ধে। তাকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনকালে টিএসসিতে সংগঠনের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লাসহ নেতাকর্মীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে শাহরিয়ার শহীদ শুভর বিরুদ্ধে, তাকে উপমুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদপ্রত্যাশী নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৪ মাস পর কমিটি হয়েছে কিন্তু ১৪ দিনও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেননি এমন অনেকেই পদ পেয়েছেন। এ ছাড়া নানান ঘটনায় বিতর্কিত, অভিযুক্ত এবং বহিষ্কৃতরাও পদ পেয়েছেন। অথচ আমি সর্বোচ্চ শ্রম দিয়েও পেলাম না। এটা রাজনৈতিক বাস্তবতা, কিছু করার নেই।’
এ বিষয়ে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কমিটিতে প্রমাণিত কোনো অপরাধী নেই। কারও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, কিন্তু আমরা দেখেছি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের জন্য কাজ করছে এবং হলসহ বিভিন্ন শাখায় দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের পদায়ন করেছি। অঞ্চলপ্রীতি, হলপ্রীতি কোনোটিই আমরা করিনি।’
