দেব-নেবতেই ভাষার ভবিষ্যৎ

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫৬ এএম

ভাষা-আন্দোলন শুরু হয়েছিল সাধারণ অর্থে শুধু মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধতা করতে নয়; জেগে উঠেছিল বাঙালির জীবন ও জীবিকার সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে বাঙালির আত্মশক্তির লোপ হবে এই আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে। সে আন্দোলনে বাংলা ভাষার শত্রু ছিল তখনকার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। যথার্থই মনে করা হয়েছিল, তাদের ক্ষমতায় রাষ্ট্রাচার থেকে বাংলা ভাষার নির্বাসন ঘটলে বাংলার জনসাধারণের জীবন ও জীবিকার অনুশীলন সংকুচিত হয়ে পড়বে। বায়ান্নের আত্মত্যাগ বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের জীবনপ্রবাহকে আত্মকক্ষে সক্রিয় রেখেছিল। পরে এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের বৃহত্তর আত্মত্যাগ আমাদের যেমন স্বাধীনতা দিয়েছে, তেমনি আমাদের জীবন ভাবনাকে ক্রমে করে তুলেছে সম্প্রসারিত। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম বড় সুফল এই যে, এই বঙ্গীয় বদ্বীপ ভূখণ্ডের মানুষেরা সরাসরি বিশ্বের সঙ্গে আত্মপরিচয় নিয়ে যুক্ত হতে পেরেছে। এরই প্রভাবে যে ভাষা দীর্ঘকাল ধরে কেবল স্থানীয় ভৌগোলিক সীমানায় আচরিত সীমিত জীবনাভিজ্ঞতার মুখোমুখি ছিল সেই ভাষা হয়ে পড়ল বিচিত্র জীবনবোধের প্রতিকূলতার মুখোমুখি। এই সূত্রে যাপিত জীবনের অনেক আচরিতকে বাংলা ভাষা পুরোপুরি ধারণ করতে পারছে না। এর মানে এই নয় যে, বাংলা ভাষার সামর্থ্য নেই। যা নেই তা হচ্ছে একদিকে নতুন নতুন বোধ এখনো ভাষায় আত্মস্থ হয়ে ওঠেনি, অন্যদিকে পুরনো অভিব্যক্তি নতুন বোধ স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছে না। অর্থাৎ যে অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি এতকাল প্রকাশিত হয়েছে তার সঙ্গে যুক্ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ পুরোপুরি সম্পন্নভাবে অনুশীলিত হয়ে ওঠেনি।

স্বাধীনতা অর্জনের পরই বলতে গেলে বাংলাদেশের মানুষের এতকালের স্থানিক সংস্কৃতির সীমানায় সীমিত জীবনবোধকে অতিক্রমের চেষ্টার সার্বিক প্রবলতার শুরু। স্বাধীনতা অর্জনের পর নিজেদের মধ্যে বিকশিত হওয়ার যে তৃষ্ণা তীব্র হয়ে উঠেছে তাতেও ঘটে চলেছে জীবনযাত্রার রূপান্তর। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার প্রভাবেও দীর্ঘকালের আচরিত জীবনবোধের অনুশীলন বা জীবনাভিজ্ঞতা যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক আঞ্চলিক সীমানায় সীমিত ছিল তার অনেক সম্প্রসারণ ঘটে চলেছে। ফলে বাংলা ভাষার পূর্বতন পরিশীলন নতুনতর জীবনবোধের কাছে পদে পদে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পড়ছে। বাংলা ভাষার এতকালের অনুশীলন এই সংযোজমান বোধকে ধারণ করে রাখতে পারছে না বলেই ভাষা ব্যবহারে সৃষ্টি হচ্ছে নৈরাজ্যের! ফলে দৈনন্দিন যাপিত জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।

২.

বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ বাংলার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানার বাইরে বসবাস করছে বলে সেখানে তাদের ভাষিক সাংস্কৃতিকতা হয়ে পড়ছে সীমিত। এই সীমিত হয়ে পড়া সেই ভৌগোলিক অন্যত্রবাসীদের ক্রমে শঙ্কিত করে চলে বলে তাদের সাংস্কৃতিকতা হয়ে ওঠে পূর্ব স্মৃতিময়তায় আচ্ছন্ন! যে সাংস্কৃতিকতায় তাদের যাপিত জীবন তার সঙ্গে অনেক কিছুই সমন্বিত করা যায় না বলে অন্যত্র নিজেদের সাংস্কৃতিকতা সংকীর্ণ হয়ে পড়তে থাকে। অবার অন্য পটভূমিও প্রভাবিত করে এই সাংস্কৃতিকতাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে অন্য দেশে বসবাসসূত্রে বাহিত হয়ে আসা আচরিত জীবনের অনুশীলন চলতে থাকায় এবং তার মাধ্যমে এতকালের স্থানিক আচরিতকে ক্রমে প্রভাবিত করতে থাকায় বাংলা ভাষার স্থানিকতার সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে ঘটে চলেছে অভিযোজন। তার ছাপও ভাষা প্রকাশে আছে বলেও বাংলা ভাষায় এখন দৃশ্যমান হচ্ছে নৈরাজ্য। এই পরিস্থিতিই রক্ষণবাদীদের গভীরভাবে হতাশ করে।

ভাষা তো জীবনেরই বাহন। সব মিলিয়ে ভাষার নৈরাজ্য নিয়ে রক্ষণবাদীদের যে উদ্বেগ তাকে উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না! কারণ যে বেনোজল প্রবাহিত হয় তাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণেরও প্রয়াস না নিলে প্লাবন ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে! কিন্তু মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রণ যেন রুদ্ধতার নামান্তর না হয়। নিয়ন্ত্রণ যেন সম্ভাবনার অভিমুখকে ইশারা করে। ভাষার সম্ভাবনাকে যেমন গ্রহণ করতে হবে সচেতনভাবে, তেমনি যা বাদ পড়ে যাচ্ছে তার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে বিচার বোধের সক্রিয়তায়!

৩.

বাংলাদেশের মতো বিকাশমান দেশে বাংলা ভাষার সংকটের একটা উৎস এর রাষ্ট্রাচারের সার্বিকতা। গণতান্ত্রিক অনুশীলনের সীমাবদ্ধতা, স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মনোভঙ্গি, শিক্ষার দর্শন ও তার অনুশীলন সার্বিক ভাষাচর্চাকে প্রভাবিত করে চলে। কারণ পূর্বোক্ত এসব অনুষঙ্গ সার্বিকভাবে জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। দেশের সার্বিক নৈরাজ্যকে ভাষাইবা কীভাবে এড়িয়ে চলবে?

বিগত দশকগুলোতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেভাবে আকস্মিক ওলট-পালটের শিকার হয়েছে তাও বাংলা ভাষার  নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর অন্যতম। ভাষায় শব্দের প্রয়োগে যে নৈরাজ্য চলছে তার উৎস তো এই বিশৃঙ্খলতাও! আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন মাদ্রাসা পদ্ধতি সাধারণ স্কুল-ব্যবস্থার সমান্তরালে শক্তিমান। সাধারণ স্কুল-ব্যবস্থার সামর্থ্য নানা বিভ্রান্তিকর ব্যবস্থায় সংকটাপন্ন। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে সচ্ছল অংশগ্রহণ করেছে ইংরেজি মাধ্যম। এই মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের চর্চার ঊনতার ফলে তাদের হাতেও পরিশীলন হারাচ্ছে। সুতরাং বাংলা ভাষা এই বহুমুখী আবর্তের মুখে এখন কিছুটা বিমূঢ়! এমন পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নই সামনে এসে যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় কোন দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে মূল নেতৃত্বে? বাংলা ভাষার সংকটের এটাও অন্যতম প্রভাবশালী কারণ। 

কোনো ভাষার সবচেয়ে শক্তিমান প্রকাশ ঘটে তার সাহিত্যে। সার্বিক সাহিত্যিকতাও নৈরাজ্য-আক্রান্তির বাইরে নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা এখনো সাহিত্যেই প্রাণবন্ত। ভাষার পরিবর্তনগুলোকে ধারণ করে এর উৎকর্ষ মুখকে নির্দেশ করছে এর সাহিত্যই। তা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে যে যাপিত জীবনকে অনুভব করছে তারও প্রকাশ ঘটছে এর সাহিত্যেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আকারে অনেক বড়। যে সীমিত গ্রামীণতা এর সাংস্কৃতিকতার মূল ভাব ছিল তাকে এই বড় অর্থনীতির প্রভাব যতটা বদলে দিয়েছে ততটাই বদলে দিয়েছে এর সাহিত্যের অভিমুখকেও!  বৈদ্যুতিন মাধ্যমের বিস্তার বৈশ্বিক অনেক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাংলা বোধের নিকটে এনে দিয়েছে। অন্য যে জীবনবোধ বাংলাদেশের মানুষকে প্রভাবিত করে চলেছে তার অনেক কিছুকেই আগে অপর মনে হলেও সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে এখন অনেক কাছের মনে হয়! এভাবেও ভাষার শব্দাবলি তার অভিব্যক্তির পূর্বপরিচয় হারিয়ে ফেলছে। তা সত্ত্বেও লক্ষ্য করার বিষয় যে, এখনো সাহিত্যই ভাষারূপের ক্রমবদলকে সজীবভাবে ধারণ করে চলেছে।

৪.

স্বাধীনতা-উত্তরকালে সর্বস্তরে বাংলা চর্চার যে আবহ ছিল বছর কয়েকের মধ্যেই তা স্তিমিত হয়ে পড়তে শুরু করে। যেসব ক্ষেত্র বাংলাচর্চা অবশ্যম্ভাবী হওয়ার কথা সেখানেও ভাটা পড়ে চর্চায়। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মধ্যবিত্ত যাদের চর্চায় বাংলা ভাষা ছিল প্রভাবশালী, তারাও বাংলাচর্চার বাইরে চলে যেতে থাকে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্ররা পড়াশোনার সুযোগ পায় মাদ্রাসায়। নানামুখী অনুদানের সূত্রে তারাই বলতে গেলে এখন প্রায় সংখ্যাগুরু হতে চলেছে। সব কিছুর ওপর এই ব্যবস্থাটাই সবচেয়ে স্থিতিশীল বলে মাদ্রাসা-সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাচর্চায় শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যদিও সাধারণ স্কুলেই এখনো সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে তা সত্ত্বেও এখানেই বাংলাচর্চা নাজুক হয়ে পড়েছে নানা রকম নীতি ও পাঠ্যসূচির অস্থিতিশীলতায়। এমনকি সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চায়ও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

৫.

এতক্ষণের আলোচনায় যা উল্লিখিত হলো তাতে প্রাধান্য পেয়েছে কেবল বাংলা ভাষার সংকটের কথাই। আমাদের সার্বিক রাষ্ট্রাচারে তথা সামগ্রিক সাংস্কৃতিকতায় বাংলা ভাষার প্রয়োগে চারদিকেই দেখা যাচ্ছে সংকট। তাহলে কি বলতে হবে আমরা সংকটের আরও গভীরের দিকেই এগিয়ে চলেছি? নানা ক্ষেত্রের প্রাসঙ্গিক আলোচনায় এমনই মনে হয় আমাদের। কিন্তু তাহলে কি আশাবাদিতার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না?

না, এতটা হতাশ হওয়ার সময়বোধ হয় এখনো আসেনি। যে সংকট এখন দেখা যাচ্ছে তা যে অনেক গভীর তাও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, ঔপনিবেশিকতার চাপের সঙ্গে লড়েও বাংলাভাষীরা বাংলা ভাষায় গভীর জীবনবোধকে ধারণ করে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছেন। যেসব সূত্রে বাংলা ভাষা সংকটাপন্ন তাকে অতিক্রমের অন্তর্নিহিত শক্তি এই ভাষার গঠনে পুরোপুরিই রয়েছে। বঙ্গীয় বদ্বীপবাসী ও বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বাংলাভাষীদের চেতনায় যে ক্রমপরিচর্যা চলমান তার অন্তর্নিহিত শক্তিই এর ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করবে বলেই আমিও বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো আশাবাদীই রয়েছি!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত