সিনথিয়া ইসলাম। বয়স ১১। রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষার্থী। টুকটাক লেখালেখি করে। হঠাৎ করেই মাকে নিয়ে বড় একটি কবিতা লিখে ফেলে সে। পড়তে দেয় স্বজনদের। স্বজনরা উৎসাহ দেন। এরপর সেটি বই আকারে বের হয় বইমেলায়। লেখার সঙ্গে আঁকা। সুন্দর রঙিন প্রচ্ছদ। সব মিলিয়ে প্রডাকশন হয় দারুণ। মেলায় গিয়ে ঘটা করে মোড়ক উন্মোচনও হয়। বলা যায়, মেলার কারণেই সিনথিয়ার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। সিনথিয়ার মতো সৃজনশীলদের জন্য ‘বইমেলা’ হচ্ছে সুকুমারবৃত্তি প্রকাশের খোলা জানালা। সেটি অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বইমেলাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে লেখার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। কারণ তারা এটা উপলব্ধি করতে পারছে যে, একজন লেখকের সামাজিক স্বীকৃতি বিশাল।
বইমেলা এখন বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাজধানীতে বাস করেন, একদিনও বইমেলায় যাননি এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া দুস্কর। শুধু তাই নয়, ঢাকার বাইরে এমনকি সময়ের প্রয়োজনে বিদেশ বিভুঁইয়ে বাস করা বাঙালিরাও শুধু বইমেলা উপলক্ষেই স্বদেশমুখী হন। স্মৃতিকাতরতায় ভর করে হাজির হন বইমেলায়। মেলা উপলক্ষে প্রবাসী বাঙালি লেখকদের অনেক বইও প্রকাশিত হয়। একুশের পদকের তালিকায়ও নিয়মিত থাকছেন প্রবাসী লেখকরা। বইমেলা আমাদের জাতীয় চেতনা ও আবেগের সঙ্গে মিশে গেছে। একুশের প্রভাতফেরি, চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, নবান্ন উৎসবের মতো বইমেলাও আমাদের জ্ঞানের উৎসব। আমাদের আবেগের জায়গা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে বায়ান্নর ভাষা অন্দোলনের পথ ধরে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রভাষা অন্দোলনের পথ বাংলাদেশ-ভাষাভিত্তিক একটি জাতি-রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। বিশে^র কোনো দেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দেয়নি। আর কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্য এত রক্তও ঝরাতে হয়নি। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করতে গিয়ে যে সর্বোচ্চ ত্যাগ বাঙালি করেছে সেই চেতনাকে জাগাতে হবে। বইমেলা হচ্ছে সেই চেতনার বাতিঘর। এর দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে হবে সর্বত্র।
সত্যি বলতে কী, একুশের ভিন্ন জ্ঞানের প্রকাশ বইমেলা। আর বইমেলা মানে মাস জুড়েই সৃজনশীল বই প্রকাশনার মৌসুম। লেখক-প্রকাশক-পাঠক সারা বছর ধরে অপেক্ষা করেন এই মেলার জন্য। পরিসর, ব্যাপ্তি ও আবেগের দিক থেকে এটি হয়ে উঠেছে আমাদের প্রাণের উৎসব। বাঙালির প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবও এই বইমেলা। এটি জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির চেতনা এবং আবেগের সঙ্গে। যে একুশের চেতনার পথ ধরেই এসেছে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার এবং এরই পথ ধরে আমাদের স্বাধীনতা। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বইমেলা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিবাদ। এই বইমেলায়ই মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। তার একটি লেখায় বলেছেন ‘একজন তরুণ বা তরুণী যখন একটি বই কিনে জ¦লজ¦ল করে ওঠে, তখন আমি তাদের চোখেমুখে অসংখ্য শুকতারা ঝলমল করতে দেখি।’ সত্যি এই ঝলমলে তারুণ্যই পাল্টে দিতে পারে সবকিছু। বইমেলাকে আরও প্রাণময়, অংশগ্রহণমূলক করে অশুভর বিরুদ্ধে শুভর জয় নিশ্চিত করতে হবে।
বইমেলা শুধু লেখক-দর্শক, পাঠকের মিলনমেলাই নয়। এর একটি বাণিজ্যিক দিকও আছে। বইমেলার এক মাসেই কমপক্ষে তিন-চার হাজার বই বের হয়। আর একেকটি প্রকাশনার পেছনে থাকে বহু মানুষের শ্রম, ঘাম, বিনিয়োগ। কম্পোজিটর, প্রুফ রিডার, সম্পাদক পরিষদ, ছাপাখানার শ্রমিক, বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী, প্রকাশক সব মিলিয়ে বহু মানুষের আয়ের সংস্থানও এই বইমেলায়। প্রকাশকরা বড় ধরনের বিনিয়োগ করেন বইমেলাকে ঘিরে। প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয় এই মেলাতেই। ফলে অর্থনীতিতেও একটি বড় অবদান রাখে বইমেলা। মেলার বই বিক্রি, ব্যাপ্তি, পরিসর যত বাড়বে যত বেশি মানুষ বই কিনবে, পড়বে ততই আমরা সমৃদ্ধতা, অসাম্প্রদায়িকতা, ইতিবাচকতার দিকে অগ্রসর হবো।
একুশের বইমেলা আমাদের পাঠ্যাভ্যাস বাড়াতেও সাহায্য করে। বাঙালির পঠন-পাঠন প্রবণতা খুব কম। অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। লেখাপড়ায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এগিয়ে থেকে আমরা দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী বুদ্ধিজীবীদের অবদানকে যথাযথ সম্মান দিতে পারতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, সেটি হয়নি। আমাদের পঠনপাঠন প্রবণতা অনেক কম। আমরা বই লেখি না, কিনি না, পড়ি না। প্রসঙ্গক্রমে রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বই কেনা প্রবন্ধ থেকে শরণ নিতে পারি এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণী গিয়েছেন বাজারে স্বামীর জন্মদিনের জন্য সওগাত কিনতে। দোকানদার এটা দেখায়, সেটা শোঁকায়, এটা নাড়ে, সেটা কাড়ে। কিন্তু গরবিনী ধনীর (উভয়ার্থে) কিছুই আর মনঃপূত হয় না। সবকিছুই তার স্বামীর ভাণ্ডারে রয়েছে। শেষটায় দোকানদার নিরাশ হয়ে বললেন, ‘তবে একখানা ভালো বই দিলে হয় না?’ গরবিনী নাসিকা কুঞ্চিত করে বললেন, ‘সেও তো ওঁর একখানা রয়েছে।’ যেমন স্ত্রী, তেমনি স্বামী। একখানা বই-ই তাদের পক্ষে যথেষ্ট।
সত্যি তাই। এ অবস্থার আজও তেমন উন্নতি হয়নি। যারা মেলায় যাচ্ছেন প্রত্যেকেই যদি অন্তত একটি করে বই কিনতেন তাহলে বিক্রি অনেক বেড়ে যেত। এরপরও বিপুল সংখ্যক দর্শক যে বইমেলায় যাচ্ছেন বই নেড়েচেড়ে দেখছেন, নতুন বইয়ের সুগন্ধ নিচ্ছেন এও বা কম কীসের? দেখতে দেখতেই হয়তো একদিন বইকেনায় মনোযোগী হবেন তারা। বইমেলার এও এক প্রাপ্তি। বইমেলায় যত বই প্রকাশিত হয় তার সবগুলোই হয়তো মানসম্পন্ন নয়। কনটেন্ট, ছাপার মান, কাগজ, প্রচ্ছদ, কাভার, বাঁধাই সবমিলিয়ে নানা অসংগতি হয়তো থাকে। মনে রাখতে হবে, নবীন লেখকের কাঁচা হাতের প্রথম বইটিও প্রকাশিত হয় বইমেলায়। তাই তাড়াহুড়ো অযত্নের ছাপ থেকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে আমরা সবকিছুকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চাই না। তরুণরা যে বইয়ের সান্নিধ্যে আসছে তাদের মধ্যে লেখার একটি প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে সেটিকে সাধুবাদ জানাতে হবে। কে জানে, আজকের নবীন লেখকটিই হয়তো আগামী দিনে একজন সফল লেখক হয়ে উঠবে?
মাসব্যাপী এমন বইমেলা দুনিয়ার কোথাও হয় না। আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা যেমন করে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, তেমনি বইমেলায়ও একটি জায়গা করে নেবে এটি আমাদের বিশ্বাস। তখন বইমেলা নিয়ে আমরা আরও বেশি গৌরব বোধ করতে পারব। বইমেলা উপলক্ষে আমাদের প্রকাশনা ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। এতে বইয়ের মান রক্ষা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এ থেকে বের হতে হবে। সারা বছরই বইয়ের প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হবে। এতে মেলার সময়ে বই প্রকাশের বাড়তি চাপ থেকে লেখক ও প্রকাশক সবাই মুক্ত থাকতে পারবেন। তখন প্রকাশনার প্রতি যথাযথ মনোযোগ এবং যত্নশীল হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি হবে। আর একটি বিষয় হচ্ছে, সারা দেশেই বইমেলা ছড়িয়ে দিতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বইমেলার আয়োজন করতে হবে। জোরদার করতে হবে পাঠাগার আন্দোলন। মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে বই নিয়ে যেতে হবে। যে তরুণ মাদকে আসক্ত, যে তরুণ ইভটিজিং করে, যে কিশোর অপরাধে যুক্ত, যে তারুণ্য ফেসবুক, ইন্টারনেটে সময় নষ্ট করছে তার হাতে তুলে দিতে হবে বই। সমাজ থেকে অন্ধকারাচ্ছন্নতা, কুসংস্কার দূর করতে হলে বইবান্ধব একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে। আমাদের শুভ চিন্তা, দর্শন ও আন্তরিকতা দিয়ে বইমেলাকে অর্থবহ করতে হবে। একুশের পথ ধরে আমাদের বইমেলা। ভাষা আন্দোলনের চেতনা তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি জনগোষ্ঠী মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করতে পারবে। শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে। শিক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো নিজস্ব ভাষা। ভাষা মানুষের আত্মবিকাশের পথ সম্প্রসারণ করে। এ জন্য একজন মানুষ তার ভাষা প্রয়োগে যতটা দক্ষতা অর্জন করবেন, জীবনের নানা ক্ষেত্রে তিনি ততটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন। ব্রতী হবেন, আনন্দযজ্ঞে।
বাংলাদেশে বসবাসরত প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও তাদের মধ্যে বেশির ভাগের ভাষারই নেই নিজস্ব বর্ণমালা। লিখিত রূপ না থাকায় তাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের অবলুপ্তিও যেন ত্বরান্বিত হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হচ্ছে, কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষাই হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আর এ দায়িত্ব শুধু বাঙালির নয়, পৃথিবীর সব মানুষের। আমরা যেন শুধু আবেগতাড়িত হয়ে অমর একুশের কথা না বলি। বইমেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লেখকদেরও সুযোগ করে দিতে হবে। তারা যেন তাদের নিজের ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে পারে বই প্রকাশ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বইমেলা আরও সার্থক হবে।
লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক
