চট্টগ্রামে সোনা পাচারকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতি মাসেই চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কিংবা জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) হাতে আটক হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সোনা। নানা কৌশলে সোনা পাচার হচ্ছে। সোনার বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সোনা চোরাচালান নিয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দুষছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। সোনা চোরাচালান নিয়ে বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরেও এসেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে দুটি সংস্থা মুখোমুখি অবস্থানে আছে। চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাসলিম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিমানবন্দরে আমার অধীনে অনেক সংস্থা কাজ করে। বিমানবন্দরে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ করে ডিজিএফআই, এনএসআই প্রতি মাসে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি পর্যবেক্ষণ দেয়। সংস্থাগুলো কাস্টমস বা অন্যান্য সংস্থার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ দিলে সেগুলো মন্ত্রণালয় হয়ে তদন্তের জন্য আমাদের কাছে আসে। এরপর আমরা অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি যে সংস্থায় কর্মরত সেখানকার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবহিত করি। পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থা অভিযুক্তর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।’
তিনি জানান, সম্প্রতি বিমানবন্দরে কর্মরত সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম, শাহীনসহ তিনজনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।
সোনা আটকের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল অভিযুক্তদের শনাক্তও করা যাচ্ছে না। গত ৩৮ দিনে (১৩ জানুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি) সাতটি চালানে ধরা পড়েছে প্রায় ১৯ কোটি টাকার প্রায় ২০ কেজি সোনা।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার সকালে ১ দশমিক ৬২ কেজি সোনাসহ জাহাঙ্গীর আলম নামে এক যাত্রীকে আটক করা হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার আলিফ রহমান জানান, ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে করে ওই যাত্রী গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তার আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে তল্লাশি করে তার সঙ্গে থাকা একটি চার্জার লাইট থেকে এসব সোনা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা সোনার বর্তমান বাজারমূল্য ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ৯টায় ওমান এয়ারের ডব্লিউওয়াই ৩১১ ফ্লাইটে আসা যাত্রীর আসন থেকে ৭ কেজি ৪২৪ গ্রাম ওজনের ৬৪টি সোনার বার জব্দ করেন বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আবদুল মতিন জানান, ওমান এয়ারের ফ্লাইটের একটি আসনের নিচ থেকে ৬৪টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। ওই আসনটিতে কেউ ছিলেন না।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শারজাহ থেকে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে ২২৩ গ্রাম ওজনের দুটি সোনার বার জব্দ করেছে এনএসআই। সিলিকন গ্লু হিটার মেশিনের লোহার পাতের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে এসব সোনা পাচারের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে শারজাহ থেকে এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট জি৯-৫২৩ শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটের যাত্রী মোহাম্মদ আতিকুল্লা সোনাগুলো নিয়ে আসেন।
২৯ জানুয়ারি চারটি সোনার বারসহ একজনকে আটক করা হয়েছে, যিনি বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার নাম ডা. এ জেড এম শরিফ। একই ঘটনায় মোহাম্মদ আলাউদ্দিন নামে এক যাত্রীকেও আটক করা হয়েছে।
২৬ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৪টি সোনার বার উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং এনএসআই।
বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাসলিম আহমেদ জানান, বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক আগমনী ২ নম্বর কনভেয়ার বেল্ট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় এসব সোনার বার পাওয়া যায়। কনভেয়ার বেল্টে একটি সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে বিশেষভাবে লুকানো ছিল। উদ্ধার করা সোনার বারের ওজন ১ কেজি ৬৩১ গ্রাম, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
২৪ জানুয়ারি রাতে দুবাই ফেরত এক যাত্রীর ব্যাগ তল্লাশি করে ১ কেজি ৭৬২ গ্রাম সোনা উদ্ধার করেন এনএসআই ও শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরা। এ ছাড়া ২ কেজি ৯৫০ গ্রাম ওজনের সোনার প্রলেপযুক্ত একটি স্যান্ডো গেঞ্জি, একটি ফুল প্যান্ট ও একটি আন্ডারওয়্যার থেকে ২৪ ক্যারেটের ১ কেজি ৪২৯ গ্রাম সোনার গোলক পিণ্ড পাওয়া যায়।
১৩ জানুয়ারি সকালে বিমানবন্দরে এনএসআই এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে সাড়ে চার কেজির বেশি পরিমাণের সোনা জব্দ করা হয়েছে। শারজাহ থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৫২ ফ্লাইটে পরিত্যক্ত অবস্থায় আসনের নিচে এসব সোনা পাওয়া যায়। যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭১ হাজার ৩৬০ টাকা।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে শুধু শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে আনা ১৩৪ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এই বিমানবন্দর দিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ১০টির বেশি সোনার চালান ধরা পড়েছে।
পতেঙ্গা থানায় দায়িত্ব পালন করা সাবেক ওসি আফতাব আহমেদ জানান, চোরাই সোনাসহ যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তারা মূলত বাহক। কারা কার কাছে সোনা পাঠাচ্ছে তার বিস্তারিত তথ্য ক্যারিয়ারদের হাতে থাকে না। ফলে চোরাচালানের মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানা গেছে, গত বছর ২৮ নভেম্বর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালকের দপ্তর থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এয়ারপোর্ট ও এয়ারফ্রেইট ইউনিটের উপকমিশনারকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত বছর ১৪ ডিসেম্বর পাল্টা চিঠি দেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এয়ারপোর্ট ও এয়ারফ্রেইট ইউনিটের উপকমিশনার অলোক কুমার হাজরা। সেই চিঠিতে বলা হয়, কাস্টমস সদস্যরা চোরাচালানিদের সফট টার্গেটে পরিণত হওয়ার যে ঢালাও অভিযোগ করা হয়েছে, তার সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ একমত নয়।
শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এয়ারপোর্ট ও এয়ারফ্রেইট ইউনিটের উপকমিশনার অলোক কুমার হাজরা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে বিষয়টি যেভাবে প্রচার হচ্ছে তেমনটি নয়। বিমানবন্দরে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। হয়তো পুরনো কোনো একটি বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে।’
