বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রকৃতিকে বদলে দেওয়া গাছদাদু 

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪০ পিএম

অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে না পারলেও গাছের গুরুত্ব বুঝতেন দুখু মাঝি। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে লাগিয়েছেন বট, আম, জামের মতো বহুবর্ষজীবী গাছ, যা ভারতের পুরুলিয়া অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বদলে দিয়েছে। লিখেছেন এজাজ পারভেজ 

পুরুলিয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগে অবস্থিত একটি জেলা। রুক্ষ মাটি ও শুষ্ক প্রকৃতির কারণে গাছপালার পরিমাণ অত্যন্ত কম। আবার গাছপালা কম বলে দিন দিন যেন মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে এলাকাটি। দুখু মাঝি এই অঞ্চলেরই বাসিন্দা। তিনি বাঘমু-ি ব্লকের সিন্দরি গ্রামের বাস করেন। আজ থেকে পঞ্চাশ বছরের বেশি আগে অভাবের তাড়নায় দুখু মাঝি থানার অধিকর্তার কাছে গিয়েছিলেন কোনো কাজের আশায়। যার ফলে তার কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু কাজের বদলে দুখু মাঝি পেলেন উপদেশ। থানার ওই অধিকর্তা তার কাছ থেকে শুনলেন সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কেন কাজ নেই, চাষাবাদ কেন হয় না। তার গ্রামের লোকেরা কেন অনত্র চলে যাচ্ছে ইত্যাদি। সব পরামর্শ শুনে তিনি উপদেশ দেন, কাজ যদি চাও তবে গাছ লাগাও। তরুণ দুখু মাঝি সেদিন কিছুই বোঝেননি। পরে অবশ্য শুরু করেন গাছ লাগানো।

প্রথমে তিনি এমন গাছ লাগাতে শুরু করেন, যে গাছ সহজে বাঁচে এবং অন্য প্রাণীর আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। আবার ঠিক করলেন এমন গাছ লাগাবেন যেটি বেঁচে থাকবে। মানুষ তার ফল খাওয়ার জন্য ডাল ভাঙবে না আসবাব বানানোর জন্য কেটে ফেলবে না। এমন বৈশিষ্ট্যের গাছ বলতে তিনি খুঁজে পেলেন বটগাছ। তিনি বটগাছ লাগিয়ে তাদের পরিচর্যা করতে শুরু করলেন। বটগাছের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত ভূমি। এ জন্য বটগাছগুলোকে তিনি রোপণ করতেন বেশ কিছুটা দূরে দূরে। এর ফলে সব গাছ রক্ষণাবেক্ষণ করা তার জন্য বেশ কঠিন হয়ে গেল। তখন তিনি একটি সাইকেল সংগ্রহ করেন। তারপরের ইতিহাস একজন অবিচল মানুষের ইতিহাস সৃষ্টির। একে একে তিনি রোপণ করেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি বটগাছের। এসব গাছের আশ্রয় নেয় নানা জাতের পশু-পাখি। এসব পাখিরা বটের ফল খেয়ে তা ছড়িয়ে দিতে থাকে চারদিকে। ফলে অপরিকল্পিতভাবেই গড়ে উঠতে থাকে গাছ। বেশ কয়েক বছর পর দুখু মাঝি শুরু করেন আম, জামসহ অন্যান্য ফলের গাছ লাগানো। এর ফলে ফলদ ও বনজ গাছের সংখ্যাও বাড়তে থাকে ওই অঞ্চলে।

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বৃক্ষরোপণের এই অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত নজর কাড়ে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। তার ফলে দুখু মাঝি ভূষিত হয়েছে পদ্মশ্রী পুরস্কারে। যেখানে তথাকথিত শিক্ষিত ও বিত্তশালী মানুষেরা গাছ কেটে ফেলেন তখন অক্ষরজ্ঞানহীন দুখু মাঝির মতো প্রান্তিক মানুষ পরম যত্নে বৃক্ষরোপণ ও লালন-পালন করছেন তা কর্তৃপক্ষের কাছে ভীষণ ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে। এ জন্য সামাজিক কাজ (পরিবেশ-বৃক্ষরোপণ) বিভাগে পদ্মশ্রী লাভ করেছেন তিনি। কর্তৃপক্ষ তার পুরস্কারের স্বপক্ষে জানিয়েছে যে, দুখু মাঝি একজন পরিবেশবিদ, যিনি বৃক্ষরোপণ করতে ও সবুজ ভবিষ্যতের জন্য সচেতনতা বাড়াতে নিজের জীবনের পাঁচটা দশক উৎসর্গ করে দিয়েছেন।তবে চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না।

গাছপাগল বলে অনেকে অনেক কথা বলতেন। কিন্তু সেসব কথাকে আমল দেননি তিনি। গাছ লাগানোকে জীবনের চলার পথের সঙ্গে যোগ করে নেন তিনি। আর সেই কাজই তাকে আলাদাভাবে চিনিয়ে দিল গোটা দেশের কাছে। অবশ্য এখন দিন বদলেছে। এখনকার তরুণরা তাকে আর পাগল বলেন না। বরং সাইকেলে চেপে গাছের দেখভাল করা এই মানুষকে আদর করে ডাকে ‘গাছদাদু’।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত