পুণ্য। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। প্রায় মাঠহীন, বিনোদনহীন হয়ে পড়া একটি শহরে বেড়ে উঠলেও এই প্রচণ্ড বুদ্ধিদীপ্ত শিশুটি ফুটবল ভালোবাসে। আর ভালোবাসে অনেক মানুষের সঙ্গে টিভিতে তাঁর ও তাঁর বাপের প্রিয় দল লিভারপুলের খেলা দেখতে।
উমরের বয়স আরও অনেক কম। সদ্য তিনে পড়া বাচ্চাটার ফুটবল বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু,সেও হাত উঁচু করে, দারুণ খুশিতে গোল উদ্যাপন করে যখন তাঁর ফুটবল ভক্ত বাপ ও অন্যরা উদ্দাম আনন্দে মেতে উঠে এক দুর্দান্ত জমায়েতে।
এই জমায়েতের কারও কারও কেবল কৈশোর পেরিয়েছে, সদ্য গোঁফের রেখা। আবার কেউ কেউ ভারিক্কি তরুণ, মোটা ফ্রেমের চশমা। টাক পড়ে যাওয়া, ভুঁড়ি বেরিয়ে পড়া বিগতযৌবন, এমনকি দুই চারজন পক্ক কেশও ।
হাতে হাত ধরে নাচছে, গলায় ঝোলানো ক্লাবের স্কার্ফটা শূন্যে উড়িয়ে দোলাচ্ছে, কোলাকুলি করছে। সব বয়সী, নানা শ্রেণির, নানা মতের মানুষের এক হয়ে এইরকম তীব্র আনন্দের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল মধ্যরাতে ঢাকার ধানমন্ডির এক রেস্টুরেন্টে। লিভারপুল খেলার প্রায় শেষ দিকে গোল দেওয়ার পর। শেষ বাঁশি বাজার পর আনন্দ তো আর থামেই না!
ইউরোপীয় ফুটবলের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট নিয়ে এইরকম ঘটনা এখন নিয়মিতই ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে দেখা যায়। লিভারপুল, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনাসহ জনপ্রিয় দলগুলোর খেলা দেখতে সমর্থকেরা গভীর রাতেও ভিড় জমায়। একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে আসে। কিন্তু, এই সব উৎসবের মধ্যেও একটা আফসোস না থেকে পারে না। আহা! এই মানুষগুলোর আনন্দ কেবল টেলিভিশনেই।
একটা সময় এ দেশের মানুষও মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখত। আমরা টেলিভিশনে যেরকম গ্যালারিভরা মানুষ দেখতে পাই, সে রকমভাবেই উদ্যাপন করত। আবাহনী আর মোহামেডান সমর্থকদের পাগলামি গোটা দেশকে বুঁদ করে রাখত।
দার্শনিক সিমোন ক্রিচলে মনে করেন, ফুটবলের এই পাগলামি, এই পরাবাস্তব শক্তি মানুষের লাখো লাখো বছরের অর্জনের একটা প্রতীক। বাস্তবতার বাইরে এক পরাবাস্তব জগৎ তৈরি করে তাঁকে জীবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভেবে যে যূথবদ্ধতা তা বাস্তব জীবনেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। ফুটবলের এই শক্তি নিয়ে কাব্যময় বর্ণনা দেন বিপ্লবী এদুয়ার্দো গালিয়ানো। এই যূথবদ্ধতা একদিন মানুষকে সাহায্য করেছিল বড় বড় প্রাণী বধ করতে,এই পাগলামি স্বপ্ন দেখিয়েছিল একসঙ্গে অসম্ভবকে জেতার। এই নিয়ে বহু বহু রচনা আছে।
এগুলো প্রায় সকলেরই জানা। কীভাবে দুর্নীতি আর লোভের বলি হয়ে আমাদের ফুটবল ধ্বংস হয়ে গেল তাও জানা। কিন্তু, মানুষ তো তাঁর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ঝেড়ে ফেলতে পারে না। তাঁকে কোন না কোন কিছু আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়। মাঠের ফুটবলের বদলে তাই ঝুঁকে পড়তে হয় টেলিভিশনের ফুটবলে।
বেশি বেশি পণ্য বেচার লোভে যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার গড়ার আগে কেবল যে পরিবারগুলোর মধ্যে দারুণ হৃদ্যতা ছিল তাই না, সামাজিক বন্ধনও ছিল খুব দৃঢ়। এর একটা দারুণ ফলাফল ক্লাব সংস্কৃতি।
পাড়ার ক্লাবটাকে ঘিরে সকলে নানা ধরনের চর্চা করত, আর ক্লাবগুলো ছিল পাড়ার সম্মানের প্রতীক। পাড়ার ক্লাবের খেলা তাই ছিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। কিন্তু, সেই যৌথ জীবন ভেঙে গেছে। আর সবকিছুর মতোই বিনোদন হয়ে পড়েছে ভীষণরকম শ্রেণি নির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হলো বিশ্বায়ন।
বিনোদনের সামষ্টিক জায়গাটা ভেঙে গিয়ে তা একক হয়ে পড়ল। সিনেমা হলে বা মাঠে না গিয়ে ঘরে ঘরে টেলিভিশন দেখাটাই নিয়ম হয়ে উঠল। প্রযুক্তির উন্নয়ন আর কঠিন শহুরে জীবন এইভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করল। একসঙ্গে হাসিকান্না উপভোগ করতে না পারা মানুষ সমাজবদ্ধতা থেকে দূরে সরতে লাগল।
পুঁজিবাদ সমস্ত মাধ্যম মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিল যে, আড্ডা দেওয়া, সামষ্টিক আনন্দ করা স্রেফ সময় নষ্ট। টলস্টয়ের তিন বিঘা জমির নায়কের মতো তাঁকে কেবল ছুটতে হবে। দাঁড়ায়ে পড়লেই সময় নষ্ট। মানুষকে বোঝানো হলো, এক সঙ্গে হাসিঠাট্টা, আনন্দ করার চেয়ে লাখ টাকার আইফোন অনেক জরুরি। একটার বদলে তিনটা ফ্ল্যাট, পরিবারের সবার জন্য গাড়ি অনেক বেশি দরকারি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ জানত যে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে বন্ধুদের সাহচর্যে, ভালোবাসায়। কিন্তু, কঞ্জুমারিজম বোঝাল, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে কেবল বিপুল ভোগে। কাজের অকাজের অসীম সম্পদ আহরণে জীবনের সবটুকু দিতে পারলে।
কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে কি তাতে দমন করা যায়? ফুটবল খেলাকে তাই বাণিজ্যে পরিণত করলেও মানুষ এ থেকে নিজেদের গোষ্ঠীবদ্ধ আনন্দ খুঁজে নিতে থাকে যতটুকু পারা যায়।
ইন্টারনেটের সামাজিক মাধ্যম, যার উদ্দেশ্যই বিপুল মানুষকে খোপে আটকে রেখে, মনোযোগ চুরি করে পয়সা উপার্জন, তাকেই ব্যবহার করে মানুষ এক হয়ে উঠতে চায়। ইতিহাসে নানা সময় দেখা গেছে, যেই প্রযুক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চেয়েছিল তাকেই ব্যবহার করে মানুষ এক হয়ে উঠে।
তাই টেলিভিশনের সামনে একদল মানুষের উন্মত্ত আনন্দ একই সঙ্গে আনন্দ ও বিষাদের। যূথবদ্ধতার আনন্দ। মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার সমস্ত চেষ্টার বিপরীতে সম্মিলিত হওয়ার আনন্দ। আর কষ্টটা, সবুজ মাঠ না পাওয়ার। আরও আরও মানুষের যূথবদ্ধ হতে না পারার। লাখো বছরের সামাজিক মানুষের টেলিভিশন মানুষ হয়ে পড়ার।
পণ্য বা উমররা হয়তো বড় হতে হতে বুঝবে, আমাদের আসল আনন্দ সবুজ মাঠে, সকলে মিলে এক হয়ে থাকার হর্ষে। টেলিভিশনে ভিনদেশি খেলা দেখার সামান্য আনন্দটুকুই নিশ্চয়ই ওদের সম্বল হবে না।
আরও পড়ুন
কোবি ব্রায়ান্ট, তাহেরী, আমরা আর তোমরা