এক ভবনেই ১৪ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হয়রানির ভয়াল চিত্র

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৩২ পিএম

রাজধানীর কলেজ গেট এলাকার অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীত পাশে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স টাওয়ারেই রয়েছে ১৪টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এই ভবনে গড়ে ওঠা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার চেয়ে অপচিকিৎসাই বেশি হয়।

এসব হাসপাতাল মূলত পরিচালিত হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, চক্ষু ও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালকে কেন্দ্র করে। এই ১৪টি হাসপাতাল মূলত পরিচালিত হয় বিশেষায়িত এই হাসপাতালকে ঘিরে। বিশেষায়িত এই হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ভাগিয়ে নিতে নিজস্ব দালাল বাহিনী গড়ে তুলেছে এই ১৪টি প্রতিষ্ঠান। নিয়োজিত দালালরা সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের রোগীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে। আর রোগী ভাগানোর কাজে দালালদের সহায়তা করছেন খোদ সরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণির চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

দালালরা এসব হাসপাতালে রোগীদের ভাগিয়ে নেওয়ার পর এসব রোগীরা চিকিৎসা তো দূরের কথা পদে পদে হয়রানির শিকার হন। চিকিৎসা সেবার নামে কিছুই হয় না, উল্টো দরিদ্র রোগীদের ভিটেমাটি বিক্রি করে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে হয় তাদের।

সরেজমিন আজ সোমবার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, টাওয়ারের সামনেই রয়েছে নামে-বেনামে বিজ্ঞাপন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নামে টাঙানো সাইনবোর্ড। সিঁড়ি দিয়ে ২য় তলায় উঠতেই চোখে পড়ে প্রাইম হাসপাতাল। এই ফোরে রয়েছে ৪টি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হচ্ছে প্রাইম হাসপাতাল, ইউনাইটেড ডেন্টাল সার্জারি, প্রাইম অর্থোপেডিক ও জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রাজধানী ব্লাড ব্যাংক। ৩য় তলায় রয়েছে কলেজ গেট ডেন্টাল কেয়ার, রয়্যাল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, ইউনাইটেড ডেন্টাল সার্জারি, রেডিয়াম ব্ল্যাড ব্যাংক, লাইফ কেয়ার, রেমিডি কেয়ার, আর এস এস ডেন্টাল সাপ্লাই এই ৭টি প্রতিষ্ঠানে। এ ছাড়া ৪র্থ তলায় ঢাকা হেলথ কেয়ার ও ৫ম তলায় যমুনা জেনারেল হাসপাতাল এবং রয়াল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল।

গত ১০ নভেম্বর ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বামী সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আসেন মাদারীপুরের মুক্তা। মুক্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সিট না পাওয়ায় পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে ভালো চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের ২য় তলায় প্রাইম হাসপাতালে নিয়ে যায় এক দালাল। প্রাইম হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাদের সঙ্গে থাকা ৮৫ হাজার টাকা হাসপাতালে জমা দেওয়া হয়। ৭ দিন পর আরও টাকা দাবি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। টাকা না দেওয়ায় সাহাবুদ্দিনের চিকিৎসা ও খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। মুক্তা স্বামীকে নিয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে চাইলে তাকে হাসপাতাল থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। মুক্তা ও তার স্বামীকে চাপ দিয়ে দুর্ঘটনায় দায়ী বাস মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসার কথা বলে আরও প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। টাকা আদায়ের এক সপ্তাহ পর মুক্তার কাছ থেকে বন্ড নিয়ে তাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। সাহাবুদ্দিনের চিকিৎসা বর্তমানে পঙ্গু হাসপাতালে চলছে।

মুক্তা বলেন, এখানে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দেখেছি আমার মতো প্রায় সব রোগীই দালালের মাধ্যমে এসব হাসপাতালে আসেন।

অনুসন্ধান করে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী, কিডনি ইনস্টিটিউট, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পঙ্গু, ক্যান্সার হাসপাতাল, হৃদরোগ, চক্ষু ও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সামনে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। এই হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার হার খুব বেশি। দেখা যায়, জরুরি বিভাগে ঢোকার আগেই দালাল রোগীকে বলতে শুরু করেন, এখানকার চিকিৎসা ভালো না। এখানকার চিকিৎসকরাই বেসরকারি হাসপাতালে অনেক অর্থের বিনিময়ে রোগীর ভালো চিকিৎসা করান। রোগীরা বোঝেন না, অন্য জায়গায় যান এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে ব্যর্থ হন।

একটা রোগী গ্রাম থেকে এসে যখন শয্যা সংকটের কারণে এসব হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন না তখন অসহায় এসব মানুষকে লক্ষ্য বানান দালালরা। তাদের সঙ্গে খাতির জমান এবং সহানুভূতি জানিয়ে সরকারি হাসপাতালের নামে গাল মন্দ করেন। এরপর সুযোগ বুঝে প্রস্তাব দেন তাদের সন্ধানে থাকা তথাকথিত ভালো হাসপাতালের। রোগীরা মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে উন্নত চিকিৎসার আশায় দালালদের মধ্যে এসব হাসপাতালে আসেন।

প্রায় প্রতিটি হাসপাতালের সামনে রোগী ধরার ফাঁদ পেতে বসে থাকে দালালরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেবল এই ১৪টি প্রতিষ্ঠানই নয় মোহাম্মদপুর ও হুমায়ূন রোডে প্রায় শতাধিক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে তারা পরিচালিত হন। বিশেষায়িত এই হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ভাগিয়ে নিলেই কমিশন মেলে। এখানে দুই ধরনের দালাল রয়েছে। কেউ কেউ নির্দিষ্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, আর কেউ কেউ যেখানে বেশি কমিশন পাওয়া যায় সেসব হাসপাতালে রোগী সাপ্লাই দেন।

এই দালাল বলেন, সরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি থাকে না। কিন্তু ঢাকায় যারা আসে তাদের চিকিৎসা প্রয়োজন। ফলে এই রোগী ও তাদের স্বজনদের সহজে ভালো চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে আসা যায়। রোগী ও তার অসুখ অনুযায়ী দালালদের কমিশন দেওয়া হয়। কেউ কেউ আবার মাসিক বেতনভুক্তও রয়েছেন। কেবল ভর্তি নয় চিকিৎসার জন্য যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে প্রয়োজন হয় সেজন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায় দালাললা। যেহেতু অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকে তাই কমিশনের বিনিময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর কথা বলে তারা নিয়ে যায়।

তবে হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রোগী সাপ্লাইয়ের কাজ করে থাকেন বলে জানান এই দালাল। তিনি বলেন, এসব সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ই আবার এই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগী দেখেন। তারা কৌশলে রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব ক্লিনিকে রোগী নিয়ে আসেন বিনিময়ে কমিশন পান। এর বাইরে হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীরাও রোগী ভাগানোর কাজে জড়িত থাকেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এই হাসপাতালে ভর্তি এমন অনেক রোগীই আছেন যাদের সঙ্গে কথা বললে জানতে পারবেন তারা পার্শ্ববর্তী এসব ক্লিনিক ও হাসপাতাল থেকে প্রতারিত হয়ে আসছেন। যেহেতু আমাদের হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় শয্যা কম তাই রোগীরা উপায় না পেয়ে চিকিৎসার আশায় যায়। আবার এখানে শক্তিশালী দালালচক্র আছে যাদের কাছে হাসপাতাল প্রশাসন নিজেই অসহায়।

ক্যান্সার হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবু হেনা মোস্তাফা জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতাল কেন্দ্র করে যে দালালচক্র গড়ে উঠেছে তা নির্মূলে আমরা কাজ করছি। হাসপাতালের পরিচালক স্যার ও আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করছি। রোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত