জ্ঞানের চর্চা বই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫৭ পিএম

বইমেলাকে বলা হয় প্রাণের মেলা। করোনার আক্রমণে ২০১৯ ও ২০২০ দু’বছর মেলাতে মোটেই প্রাণের সাড়া পাওয়া যায়নি। মেলা আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। ২০২৩ সালে শঙ্কা নিয়েই পূর্ণাঙ্গ মেলা হয়। কিন্তু সে বছর কাগজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে বইয়ের দাম নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কাটি ছিল বাস্তব। কাগজের দামের কারণে সেবার প্রকাশকরা তাদের বইয়ের দাম শতকরা ৩৫ ভাগ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। আর চলতি বছরও কাগজের উচ্চমূল্যসহ নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল। এবার তো এমন কথাও জানিয়েছেন প্রকাশকরা যে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াতে তাদের বইয়ের মূল্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ২০২৪ এর বইমেলাতেও বইয়ের দাম নিয়ে শঙ্কার বাস্তবতা এড়ানো যায়নি।

বইয়ের গ্রাহক ও পাঠক দুটিই নাকি ইতিমধ্যে কমে গেছে। আগের মেলাগুলোতেও দেখা গেছে দর্শক যত পাওয়া যায় ক্রেতা তত পাওয়া যায় না। করোনার কারণে দু’বছরের বিরতির কারণে ক্রয়ের অভ্যাস এমনিতেই হ্রাস পাওয়ার কথা। এই পরিস্থিতির মধ্যে কাগজের সংকটে বইয়ের ধারাবাহিক দাম বৃদ্ধির ঘটনা ক্রয়কে আরও সংকুচিত করবে এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। সেটাই ঘটেছে। বই বিক্রি গত বছরের তুলনাতে কমেছে।

এছাড়া, মেলার নিরাপত্তা ইস্যুটি ইদানীং একটা শঙ্কার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে এমনটি ছিল না। কয়েক বছর আগে বইমেলাতে প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায়কে মৌলবাদী জঙ্গিরা আক্রমণ করে, এবং তিনি নিহত হন। অভিজিৎ রায়ের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকেও তারা হত্যা করে। হন্তারক ওই সন্ত্রাসীদের সবাই ধরা পড়েনি, প্রাণদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে গেছে। পুলিশ তাদের আদালতে এনেছিল। পলাতকরা যাতে সীমান্ত ডিঙিয়ে যেতে না পারে সে জন্য রেড অ্যালার্ট জারির ঘোষণা আমরা শুনেছিলাম, কিন্তু পলাতক দুই জঙ্গি এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিবাবের মতো এবারও জানানো হয়েছিল যে মেলায় পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে পুলিশ নাকি মেলাতে জঙ্গিদের প্রবেশ ঠেকাতে হবে এই দায়িত্বই শুধু নেয়নি, বইয়ের ভেতরে আপত্তিকর কিছু লুকিয়ে থাকলে সেসব জিনিসকেও তারা পাকড়াওয়ের দায়িত্ব পেয়েছে।

বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষও ‘আপত্তিকর বই’ নিয়ে অত্যন্ত সজাগ। বইয়ের ভেতরে আপত্তিকর কিছু ঢুকে পড়েছে এটা টের পাওয়া গেলে সে বই মেলাতে নিষিদ্ধ করা হবে। গত দুই বছর যতটা মনে পড়ছে দুই/তিনটি বই মেলাতে প্রবেশাধিকার হারায়। কেবল বই-ই নয়, বইয়ের প্রকাশকও মেলায় প্রবেশাধিকার না পাওয়ার ঘটনা বেশ আলোচনায় ছিল। এবার অবশ্য তেমন ঘটনা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। বই ও বইয়ের বিপণন নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভীতিটাকে যৎসামান্য বলা যাচ্ছে না। কিন্তু বইয়ের বিচার তো কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়, বিচার করবে পাঠক। পছন্দ হলে পাঠক আদর করে কাছে টেনে নেবে, অপছন্দ হলে ছুড়ে ফেলে দেবে সর্বত্র গৃহীত নিয়ম এটাই। বইয়ের বিরুদ্ধে পাল্টা বই লেখারও সুযোগ আছে। মোটকথা বই কোনো পাহারাদার পছন্দ করে না; পাহারাদারকে দেখলে বরং ভয় পায়, যেটা মনে হয় বাংলাদেশে এখন ঘটছে।

ওদিকে আবার বইয়ের চাহিদা গেছে কমে। একটা কারণ প্রযুক্তি। প্রযুক্তি ‘সহায়তা’র দরুন বই এখন না পড়লেও চলে। বই দেখা যায়, পর্দায়। টিপলেই চলে আসে। কিন্তু বই তো দেখার বস্তু নয়, পড়বার জিনিস; সে চায় পাঠকের আশপাশে থাকবে বন্ধুর মতো, পাঠক যখন তখন যে অংশ দরকার তা হাতে তুলে নেবে, পড়বার, বুঝবার, আন্দোলিত হওয়ার জন্য। প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন কিন্তু আগে কখনো বইয়ের পাঠক কমায়নি, উল্টো বাড়িয়েছে। কাগজ, ছাপাখানা, রেডিও, সিনেমা, টেলিভিশন, এসব যুগান্তকারী উদ্ভাবনের কোনোটাই বইয়ের সঙ্গে শত্রুতা করেনি; কম্পিউটার ও ইন্টারনেট যেটা করে যাচ্ছে। দোষটা কিন্তু প্রযুক্তির নয়, দোষ প্রযুক্তির মালিকানার। প্রযুক্তির পুঁজিবাদী মালিকানা জ্ঞানের চর্চা ও সূূক্ষ্ম আনন্দ বোঝে না, বোঝে এবং চেনে শুধু মুনাফা। মুনাফার রাক্ষস-খোক্কস আরও অনেক কিছুর মতো গ্রন্থপাঠকেও গিলে খেয়ে ফেলে নিজেকে স্ফীত করতে চাচ্ছে। মুনাফাখোরেরা চক্ষুষ্মান মানুষ চায় না, হাবাগোবা ভোক্তা চায়। বই পড়ে মানুষের চক্ষু খুলে যাবে, এই সম্ভাবনাকে তারা গলাটিপে মারতেই চায়। বইয়ের অমর্যাদা ওই কারণেই ঘটছে। দোষ প্রযুক্তির নয়, দোষ প্রযুক্তির মনুষ্যত্ববিদ্বেষী মালিকানার। নন্দ ঘোষেরই। তবে নকল নয়, আসল নন্দ ঘোষই বটে।

কিন্তু বই ছাড়া তো মানুষ বাঁচবে না, যেমন বাঁচবে না খাদ্য ও পানীয় না পেলে। মনের ক্ষুধা দেহের ক্ষুধার মতো প্রবল না হলেও, অপরিহার্য বটে। জ্ঞান না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, আর জ্ঞানের চর্চা তো বই ছাড়া একেবারেই অসম্ভব।

বইয়ের চাহিদা বাড়ানোটা তাই অত্যাবশ্যক। চাহিদা কী করে বাড়ানো যাবে? একটা উপায় বই নিয়ে নিয়মিত আলোচনা। বর্তমান যুগটাকে যে মিডিয়ার যুগ বলা হয়, সে-বলাতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। মিডিয়াতে বই নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও বিজ্ঞাপন চাই। মিডিয়ার মালিকরা এ ব্যাপারে উৎসাহী হবে না, উদ্যোগ নিতে হবে মিডিয়ার কর্মীদের। বুদ্ধিজীবীদেরও কর্তব্য চাপ সৃষ্টি করা বই যাতে আলোচনার বস্তু হয়। চাহিদা বাড়লে প্রশাসকরাও উৎসাহ পাবেন প্রকাশনার মান ও পরিমাণ বৃদ্ধিতে। প্রত্যেকটি শহরে একটি পুস্তক-বিপণন এলাকা থাকা দরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে এই আয়োজনে উদ্যোগী করা আবশ্যক।

সর্বোপরি চাই পাঠাগার। দেশে অনেক পাঠাগার আছে, কিন্তু বেশির ভাগ পাঠাগারেই প্রাণ নেই, পাঠাগারে প্রাণসঞ্চার দরকার। দরকার নতুন নতুন পাঠাগার স্থাপন। তা পাঠাগার প্রাণবন্ত করবার উপায়টা কী? পাঠাগারে বই থাকবে, পরিবেশ আকর্ষণীয় হবে। কিন্তু ওই দুই উন্নয়ন পর্যাপ্ত হবে না। পাঠাগারে চাই বই নিয়ে আলাপ আলোচনা, মতের প্রাণবন্ত আদান-প্রদান। চাই বিশেষ বক্তৃতা। নানা ধরনের প্রতিযোগিতা। এক কথায় বলতে গেলে পাঠাগারগুলোকে সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। পাঠাগারকে ঘিরে নাট্যাভিনয়, গানের আসর, বিতর্ক, সামনে জায়গা থাকলে খেলাধুলার আয়োজন এসবের মাধ্যমে মানুষকে টেনে আনা দরকার ঘরের একাকিত্ব ও অন্ধকার থেকে প্রশস্ত একটি সামাজিকতায়। তেমনটা ঘটলে সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়ন ঘটবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ও পরিবেশের বিচ্ছিন্নতা হ্রাস পাবে, এবং আকর্ষণ বাড়বে গ্রন্থপাঠ ও পাঠ থেকে সুফল লাভের প্রতি।

জ্ঞানের চর্চা সমাজে কমে যাচ্ছে, কারণ দুঃশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে টাকার। এই শাসন ভাঙা চাই। ভাঙতে হলে জ্ঞানের চর্চা না করে উপায় নেই। নদী শুকালে যেমন জনপদের বিপদ ঘনায়, জ্ঞানের চর্চা শুকিয়ে গেলেও তেমনি মনুষ্যত্বই হুমকির মুখে পড়ে। এজন্যই আমাদেরও বইয়ের কাছে ফিরতে হবে, পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত