ভিকারুননিসায় কী চলছে?

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০২ এএম

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ সেই ১৯৫২ সাল থেকে নারীশিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এই স্কুলের ঐতিহ্য, সাফল্য, নিয়মানুবর্তিতা একে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে পরিণত করেছে এবং এখানকার ছাত্রীরা দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু, মানুষ গড়ার এই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যায়তন আশঙ্কাজনকভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির কবলে পড়ে কলুষিত হয়ে ডুবতে বসেছে। সম্প্রতি স্কুলটির আজিমপুর শাখার গণিতের শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে প্রাইভেট কোচিংয়ের সময় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে এখন স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। দেশ রূপান্তরের রিপোর্টে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও মুরাদ হোসেনকে প্রথমে বাঁচানোর চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটিরই একটি সিন্ডিকেট। শেষমেশ অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে চাপে পড়ে গত সোমবার রাতে গভর্নিং বডির বৈঠকে শিক্ষক মুরাদ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

জানা গেছে গত ১৪ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি চলছে স্থায়ী অধ্যক্ষ ছাড়াই। কখনো স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষা ক্যাডার থেকে অধ্যক্ষ আসছেন। আবার কখনো-বা স্কুল থেকেই একজনকে ভারপ্রাপ্তের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য সেখানেও মানা হয় না জ্যেষ্ঠতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিনিয়রদের ডিঙিয়ে জুনিয়রদের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর যিনিই দায়িত্ব পাচ্ছেন তিনিই একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে জানা যায়, যৌন নির্যাতনের ওই অভিযোগ তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটির গত ২২ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে তিন ছাত্রীর আনা অভিযোগের ঘটনাগুলো এক বছর আগের। এরপর তিনি পবিত্র হজ করার পর এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বিধায় তাকে বরখাস্ত না করে শেষবারের মতো সতর্ক করে অন্য কোনো শাখায় বদলি করা যেতে পারে। এ ছাড়া অভিযোগকারীরা উপযুক্ত কোনো তথ্যপ্রমাণ দিতে না পারায় তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়া শাখা প্রধানদের মনিটরিং আরও বাড়াতে হবে।’

তবে এ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনরত অভিভাবকরা। শুরুতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন না দিলেও অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে তাকে অন্য শাখায় বদলির সুপারিশ করা হয়। অভিভাবক কমিটির নেতারা মনে করছেন অভিযুক্ত শিক্ষক মুরাদ হোসেনের ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও শিক্ষক প্রতিনিধি ড. ফারহানা খানম। অভিভাবকরা এখন অধ্যক্ষ, শিক্ষক প্রতিনিধি ও অভিযুক্ত শিক্ষক তিনজনেরই পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন এবং  তাদের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভিকারুননিসার মতো নামজাদা বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্র্তৃক ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও এরকম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোড়ন তৈরি হলেও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামানো যায়নি।

ভিকারুননিসাতে নানাবিধ দুর্নীতি ও দলবাজি ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অবৈধভাবে ভর্তি করানোর জন্য জনপ্রতি ৪-৫ লাখ টাকা উৎকোচ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। কোচিং ব্যবসা এতটাই ফুলেফেঁপে উঠেছে যে, একে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও অন্যদের দলাদলি কদর্য রূপ নিয়েছে। এই বিপুল ব্যবসার কারণে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণে। ভিকারুননিসার মতো বিদ্যালয়ে শিক্ষার এ ধরনের ভয়াবহ বাণিজ্যিকীকরণ দেশের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্যই একটি অশনিসংকেত। সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ে নজরদারি করার কথা তারাও এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কি না সেই ব্যাপারটাও তদন্ত করা জরুরি। ভিকারুননিসার মতো প্রতিষ্ঠানের ডুবে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত