বাণিজ্য প্রতিযোগীদের থেকে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৪ এএম

রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্যায়ণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা সহজীকরণসহ বিভিন্ন সূচকে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। পোশাক খাতে কিছুটা সন্তোষজনক চিত্র উঠে এলেও, রপ্তানি সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। প্রতিযোগী দেশগুলো শুধু পোশাকের ওপরই নির্ভরশীল থাকেনি, তারা ক্রমাগত বৈচিত্র্যায়ণের মাধ্যমে উন্নতি করেছে। সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) প্রকাশিত জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অনুষ্ঠানে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন সানেমের চেয়ারম্যান ড. সেলিম রায়হান। ড. রায়হান বলেন, ভিয়েতনাম এ ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ, যেখানে বাংলাদেশ এখনো চেষ্টাই করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ২০০৬ থেকে ২০২১ পর্যন্ত মাত্র ৯টি নতুন পণ্য যুক্ত করেছে, যেখানে ভিয়েতনাম যুক্ত করেছে ৪১টি পণ্য। প্রতিযোগী দেশটি দ্রুতগতিতে আরও বেশি আয় করেছে। নতুন যুক্ত হওয়া পণ্য থেকে ২০২১ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যেখান থেকে ভিয়েতনাম আয় করেছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।’

রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সূচকে ভিয়েতনাম, ভারত এবং থাইল্যান্ডের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন সেলিম রায়হান। একই সঙ্গে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশ শুধু ভিয়েতনামই নয়, অন্য প্রতিযোগীদের চেয়েও অনেক পিছিয়ে। ভারত ১৬টি নতুন পণ্য তাদের রপ্তানির ঝুড়িতে যুক্ত করে ২০২১ সালে আয় করেছে ৬১২ কোটি ডলার। থাইল্যান্ড ৩১টি নতুন পণ্যে আয় করেছে ৬৬১ কোটি ডলার।

সানেম বিশ^ব্যাংকের এন্টারপ্রাইজ জরিপ ২০২২ উপস্থাপন করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দাম ও কাঁচামালের সহজলভ্যতায়। এ খাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিবাণিজ্য নীতি ও শুল্ক জটিলতায়, ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। পরের তিনটি ঝুঁকি প্রায় সমপর্যায়ের। বন্দর সুবিধায় ৪৮ দশমিক ২, কর ব্যবস্থায় ৪৮ দশমিক ১ ও দক্ষ শ্রমিকপ্রাপ্তিতে ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া বিনিয়োগে ৩৮ দশমিক ১, মান ও সার্টিফিকেশনে ৩৭ দশমিক ৩, ব্যবসা নিবন্ধনে ৩৬ দশমিক ৪, জমিতে ৩৫ দশমিক ২, আইন-আদালতে ৩৩ দশমিক ১ ও পণ্য পরিবহনে ৩১ দশমিক ১ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে।

কর ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ র‌্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে। কর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অবস্থান ১৫১তম। প্রতিবেশী দেশ ভারত ১১৫, ভিয়েতনাম ১০৯, চীন ১০৫, মালয়েশিয়া ৮০ ও থাইল্যান্ড ৬৮তম অবস্থানে রয়েছে।

ডলারের বিনিময় হারে বাংলাদেশ পিছিয়ে। জরিপ বলছে, বাংলাদেশ ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় একই অবস্থায় ছিল। ২০২২ সালের পর বাংলাদেশে ডলারের দাম বেড়েছে। ভারত ২০১০ সালে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিচে থাকলেও এরপর প্রতিবছরই তারা ডলারের দাম বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম ডলারের দামের ক্ষেত্রে ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ওপরে থাকলেও ২০২১ সালের পর বাংলাদেশের নিচে অবস্থান করছে।

সানেম বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত নেওয়া মুদ্রানীতি বেশিরভাগই অকার্যকর। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেটি বর্তমানে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় প্রাতিষ্ঠানিক র‌্যাংকিংয়েও বাংলাদেশের অবস্থান অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে। বিশ^ব্যাংকের সুশাসন সূচক ২০২১-এর তথ্য দিয়ে সানেম জানিয়েছে, বাংলাদেশ অন্য প্রতিযোগীদের ধারে-কাছেও নেই। এই সূচকগুলো বেশি হওয়া মানে দেশটির অবস্থান ভালো। বাকস্বাধীনতা সূচকে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও চীনের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ভারত ও মালয়েশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। কথা বলা বা বাকস্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২৮ দশমিক শূন্য ২, যেখানে ভারতের ৫১ দশমিক ৬৯ ও মালয়েশিয়া ৩৯ দশমিক ১৩ পয়েন্ট। এ সূচকে চীনের ৫ দশমিক ৩১, থাইল্যান্ডে ২৭ দশমিক শূন্য ৫ ও ভিয়েতনামের ১৩ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্ট।

তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সূচকে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এই সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ১৬ দশমিক শূন্য ৪, যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত ২৪ দশমিক ৫৩, চীন ২৯ দশমিক ২৫, মালয়েশিয়া ৫০ দশমিক ৯৪, থাইল্যান্ডে ২৭ দশমিক ৩৬ ও ভিয়েতনামের ৪৪ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।

সরকারের কার্যক্ষমতা সূচকেও তলানিতে অবস্থান বাংলাদেশের। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সূচক ২৮ দশমিক ৮৫, যেখানে ভারতের ৬২ দশমিক ৫, চীনের ৭৬ দশমিক ৪৪, মালয়েশিয়ার ৮১ দশমিক ২৫, থাইল্যান্ডের ৬০ দশমিক ৫৮ ও ভিয়েতনামের ৬২ পয়েন্ট। আইনের শাসন সূচকেও বাংলাদেশ অন্যদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এই সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২৮ দশমিক ৮৫, যেখানে ভারতের ৫১ দশমিক ৯২, চীনের ৫৩ দশমিক ৮৫, মালয়েশিয়ায় ৭০ দশমিক ১৯, থাইল্যান্ডে ৫৫ দশমিক ৭৭ ও ভিয়েতনামের ৪৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট।

দুর্নীতি দমন সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ১৮ দশমিক ২৭, যেখানে ভারতের ৪৬ দশমিক ৬৩, চীন ৫৮ দশমিক ১৭, মালয়েশিয়া ৬১ দশমিক শূন্য ৬, থাইল্যান্ডে ৩৫ দশমিক ১ ও ভিয়েতনাম ৪৭ দশমিক ১২ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ জটিলতাগুলোও তুলে এনেছে এই গবেষণা সংস্থাটি। বিনিয়োগ সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সানেম জানিয়েছে, বিনিয়োগের জটিলতার মধ্যে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ বিনিয়োগের প্রধান বাধাগুলোর একটি। দুর্বল পুঁজিবাজার রয়েছে জটিলতার দ্বিতীয় অবস্থানে। তৃতীয় বিনিয়োগ জটিলতায় বলা হয়েছে দুর্বল বিনিয়োগ আনা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনার ক্ষেত্রেও অন্যদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য দিয়ে সানেম বলছে, মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের এফডিআই শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ১ দশমিক ৫৭, এলডিসি দেশগুলোতে ১ দশমিক ৭৯, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ১ দশমিক ৮৮ এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

রপ্তানি বহুমুখীকরণে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা ডলারের বিনিময় হার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের ওপর কঠোর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর মুদ্রানীতি এটিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

এই অর্থনীতিবিদ দীর্ঘস্থায়ী সুদহারের পাশাপাশি অযোগ্য ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে বলেন, এসব নীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অকার্যকর। তিনি বৈশ্বিক মানদ-ের তুলনায় লজিস্টিকসে বাংলাদেশের নিম্ন কর্মক্ষমতারও সমালোচনা করেন।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ আমদানি শুল্কের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে সানেম নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশের শুল্কনীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে দেশে সংস্কার জরুরি। একই আকারের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কম কর-জিডিপি অনুপাতও শঙ্কার কারণ। রাজস্ব আদায়কে জোরদার করার জন্য ব্যাপক আর্থিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত