চট্টগ্রাম সদরঘাট থানা এলাকায় গত ২ জানুয়ারি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরির ঘটনার কিনারা করতে গিয়ে রহস্য উন্মোচিত হলো আরও সাতটি চুরির মামলার। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গত আড়াই মাসে ওই চক্রের দলনেতাসহ অন্তত ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সদরঘাট থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে চুরি হওয়া ৫৭ ভরি স্বর্ণালংকার। পাশাপাশি তিন ‘দলনেতার’ নেতত্বে প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্য নগরে কীভাবে, কোন কৌশলে চুরির ঘটনা ঘটায় সে সবের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে পুলিশ।
চুরির মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক অর্ণব বড়ুয়া জানান, শহরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই এই সংঘবদ্ধ চোরচক্রকে ধরা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে নগরের মাঝিরঘাট এলাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি করে তারেক নামের এক যুবক। এ ঘটনায় তারেকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা উদ্ধার করেন তিনি। একই মাসে একটি গোডাউনে পণ্য চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হন স্বর্ণ ও নগদ টাকা চুরির দলনেতা মনির হোসেনসহ ১১জন। পণ্য চুরির মামলায় কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে এসে গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে নগরের বারিক বিল্ডিং রশিদ মাস্টারের বাড়ি থেকে ১৭০ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করেন মনির হোসেন ও তার সহযোগীরা। এরপর ২ জানুয়ারি রাতে সদরঘাট থানাধীন মোগলটুলি কাটা বটগাছতলা এলাকায় ইয়াকুব টাওয়ারের বাসিন্দা নুরুন নাহারের বাসা থেকে ১৬ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরি হয়। এই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এসআই অর্ণব একে একে গ্রেপ্তার করেছেন চক্রের সদস্যদের।
নুরুন নাহারের বাসায় চুরির মামলায় গ্রেপ্তার আসামি মো. রিয়াজ ওরফে আকাশ গত ২৪ জানুয়ারি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এতে তিনি শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে স্বর্ণ ও নগদ টাকা চুরির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য ফাঁস করেন। আকাশ আদালতকে জানান, চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে মূলত তিনজনের নেতৃত্বে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। এই তিনজন হলো মনির হোসেন, আবু বকর ওরফে তারেক ও আরিফ হোসেন মেহেদী। এই তিনজনের নেতৃত্বে আছে ৪০/৫০ জন সদস্য। তাদের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। পৃথক তিনটি দলে ভাগ হয়ে চুরি সংঘটিত করে তারা। তিন দলনেতার মধ্যে কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হলে তার জামিন ও মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ চালান বাইরে থাকা দলনেতা। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত আকাশের দলনেতা মনির ও তারেকের জন্য নিয়মিত খরচ পাঠাতেন মেহেদী।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ জানিয়েছে, চুরি করুক আর না-ই করুক চক্রের সদস্যকে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ দিতেন মেহেদী। চক্রের সদস্যদের পেছনে মেহেদী দৈনিক খরচ করতেন ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
আকাশের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, প্রথমে তারা নগরের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে বেড়ান। যে বাসা বা বাড়িতে দুই/ তিনদিন বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে না সেসব বাসাবাড়িকে টার্গেট করে রেকি করে। যে বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে সেটির পেছনের পয়ঃনিষ্কাষণ পাইপ বেয়ে ঘরে ঢুকে তারা। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় চোর চক্রের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যকে যার বয়স ১২/১৩। চুরি সংঘটনের পর সঙ্গে সঙ্গে চুরির নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার বাগবাটোয়ারা করে ফেলেন তারা। চুরির অধিকাংশ মালামাল পান দলনেতা মেহেদী। মেহেদীর গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায়। মনির হোসেনের (৩০) গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলার দৌলত খা থানাধীন চরখলিফা দিদারউল্লাহ এলাকায়। বর্তমানে থাকের নগরের বহদ্দারহাট বারই পাড়ার রাশেদ কলোনিতে। তারেকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। থাকেন নগরের বন্দর থানা এলাকায়।
পুলিশ বলছে, মূলত আকাশকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে স্বর্ণ ও নগদ টাকা চুরির হোতা আরিফ হোসেন মেহেদীর নাম। এই একটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে নগরে সংঘটিত আরও সাতটি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরির ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে।
এসআই অর্ণব বড়ুয়া জানান, ইয়াকুব টাওয়ারে চুরির ঘটনায় ঘটনাস্থল ও তার আশপাশের এলাকার ৫৪টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তকাজে তাকে সহায়তা করেন তারই বন্ধু আরিফ রনি। ইয়াকুব টাওয়ারের চুরির ঘটনায় গত ৪ ও ৫ জানুয়ারি ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে টিপু, জীবন, মেহেদী হাসান রুবেল, সোয়ান নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জানা গেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উক্ত চারজনের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাদের কোর্টে চালান দেওয়া হয়। তবু থেমে যাননি এসআই অর্ণব বড়ুয়া। ৫৪টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ফের বিশ্লেষণ করেন তিনি। ঘটনাস্থল কাটা বটগাছতলা এলাকায় দুজনের গতিবিধি ধরা পড়ে। এরপর গত ২৩ জানুয়ারি বিকেলে বারিক বিল্ডিং এলাকা থেকে আকাশ, ইমরান, রাসেল ও রাতুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অর্ণব বড়ুয়া বলেন, আকাশ দুর্ধর্ষ প্রকৃতির চোর। গ্রেপ্তারের সময় সে এক পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে বসে। অনেক কাটখড় পুড়িয়ে স্বর্ণ ও নগদ টাকা চোর চক্রের দলনেতা শনাক্ত করেছি। গ্রেপ্তারও করেছি। আদালতে মামলার শুনানিতে অংশ নিতে গিয়ে দেখি অনেক সিনিয়র আইনজীবী দুর্ধর্ষ চোর মেহেদী ও আকাশের পক্ষে আইনি লড়াই করছেন। এরা আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে ফের কারও না কারও বাসাবাড়িতে চুরির বড় ঘটনা ঘটায়।
