কবি, গদ্যকার, অনুবাদক মৃদুল মাহবুবের প্রকাশিত কবিতার বই ‘জলপ্রিজমের গান’, ‘কাছিমের গ্রাম’, ‘উনমানুষের ভাষা’ ও ‘মানুষ একাকী এক মিথ’। প্রকাশিত গদ্যের বই ‘কবিতাকলা ভবন : শিল্প ও সাহিত্যবিষয়ক ব্যবহারিক চিন্তা’। অনুবাদ ‘সুখ ও অন্যান্য ছোটো অতি প্রয়োজনীয় বিষয়’। কথা বলেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
আপনার কী কী বই আসছে বইমেলায়?
মৃদুল মাহবুব : ‘এ-ই সরল পথ’ নামে আমার একটা দীর্ঘ কবিতার বই এসেছে। বৈভব প্রকাশনী থেকে।
আপনার বই পাঠককে কেন পড়তে বলবেন?
মৃদুল মাহবুব : আমার কাছে সাহিত্যের নান্দনিক ব্যাপার যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ব্যবহারিক দিক। সাহিত্য আমাদের অন্তর্দৃষ্টি পরিবর্তন করে। বাস্তব ক্যারেক্টার থেকে আপনি যা শিখতে পারবেন, সম্পর্ক বোধ করবেন, ফিকশনাল ক্যারেক্টার এর থেকে কম কিছু না। মহৎ সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সে সব সময়ে রিলিভেন্স থাকে। আমি আমার লেখালেখি দিয়ে এই কানেকটিভিটি গড়তে চাই পাঠকের সঙ্গে। যাতে সে যে বাস্তবতার ভেতর থাকে, তার থেকে বেশি কিছু দেখতে পায়। সে যেন বড় রাস্তায় দাঁড়ানো ল্যাম্পপোস্ট দেখে বলতে পারে বেঁচে থাকা সার্থক। সাহিত্য যেন একটা নিজস্ব বোধ দেয় পাঠককে। আমাদের বাইরের এই বস্তু দুনিয়ার সঙ্গে মানুষকে যোগাযোগ করিয়ে দিতে চাই। ফলে যারা জীবনকে একটু অন্যভাবে দেখতে চায়, তাদের আমি পড়তে বলি আমার কবিতা, গদ্য বা অনুবাদ।
বই পৌঁছানোর কোনো কৌশল কি আপনি অবলম্বন করেন?
মৃদুল মাহবুব : আমি নিজের বই, লেখা প্রচার করতে ভালোবাসি। আমি চাই পাঠক আমার লেখা পড়ুক। এজন্য আমার প্রকাশক বেশ হেল্পফুল। সে প্রচার করে। আমি যতটা পারি প্রকাশিকার সঙ্গী হই। এর বাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি লেখায় কী কী করতে চাই, নতুন বইয়ে কী আছে, সামনে কী লিখছি এগুলো প্রচার করি।
আমাদের বই প্রকাশ, প্রচার, আলোচনার প্রবণতা অনেকটা ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
মৃদুল মাহবুব : সারা বছর বই প্রকাশ ও আলোচনা হলে তা আমাদের সমাজের জন্য ভালো হতো। বেটার সোসাইটি তৈরিতে বইয়ের, পাঠকের বড় ভূমিকা আছে। যে সমাজে সারা বছর প্রকাশ হয় ও বেশি মানুষ পড়ে সেই সমাজ আরও বেশি কানেক্টেড পরস্পরের সঙ্গে। মানুষ যত একে-অন্যের সঙ্গে থাকবে, জীবন তত সুন্দর ও সহজ হবে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বই ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। এর কারণ আমাদের কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির ব্যর্থতা। আমাদের মিডিয়া বইকে লাইফ স্টাইলের অংশ করে তুলতে পারেনি। সারা বছর বইয়ের কোনো খোঁজখবর রাখে না।
বইয়ের পাঠক কমেছে না বেড়েছে?
মৃদুল মাহবুব : আমাদের দেশে পরিসংখ্যান হয় না। তবে আমেরিকার একটা জরিপ দেখেছিলাম, তাতে তরুণদের বই পড়ার পরিমাণ বেড়েছে। আমাদের দেশে প্রকাশক ও বইয়ের প্রকাশ-সংখ্যা বেড়েছে। পরোক্ষভাবে বোঝা যায় পাঠক বেড়েছে। তবে ২০ কোটির দেশে যত পাঠক দরকার, ততটা বাড়েনি। মানুষের আয়, অবসর, প্রযুক্তি, সমাজের কমপ্লেক্সিটি যত বাড়বে, কালচারের ভোক্তাও বাড়বে। ফলে আমার হিসাবে পাঠক কমেনি।
বইমেলার আয়োজন ও পুরস্কার নিয়ে সার্বিকভাবে বাংলা একাডেমির ভূমিকাকে কেমন দেখছেন?
মৃদুল মাহবুব : সাহিত্য পুরস্কার ব্যাপারটাই ন্যক্কারজনক আমাদের দেশে। এ নিয়ে বলতে মন চায় না।
বইমেলাকে কীভাবে লেখক-পাঠক ঘনিষ্ঠ করে তোলা যায়?
মৃদুল মাহবুব : আমদের এখানে যে বইমেলা হয় তা আদিকালের বৈশাখী মেলার ফরমেটে হয়। অর্থাৎ সবাই তাদের মাল-সামাল নিয়ে বেচাবিক্রি করল। বই ব্যাপারটা শুধু পণ্য না। এটা হার্ড গুডস না, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। এই ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির প্রেজেন্টেশন ঠিকমতো নেই। ফলে মেলায় দেখবেন, অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ ও মিডিয়া ব্যস্ত। ফোকাসটা প্রকৃত ভালো বইকে কেন্দ্র করে হওয়া দরকার। নতুন তরুণ লেখকদের উঠে আসার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে এটা পাঠকবান্ধব মেলা করা দরকার। মেলার পরিবেশ, টয়লেট ব্যবস্থা, বসা ও খাবার, রেস্ট, আড্ডা, আলোচনা আড্ডার জায়গা নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ। কিন্তু এর ছোঁয়া মেলায় নেই। আপনি স্টল ও বুকলিস্ট খুঁজে পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা পাবেন না। এটা সনাতনী ফরমেটের একটা মেলা। সমকালে চলে না। এগুলো নিয়ে ভাবা দরকার।
