শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে গয়না জমি বিক্রি

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৪:০৩ এএম

বগুড়ার শিবগঞ্জের ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম। তিনি যেন বিজ্ঞানের নেশায় আসক্ত। তাই তো নিজের ব্যবসায়িক আয় ও স্ত্রীর গয়না বেচে দিয়ে রসকষহীন ‘পদার্থবিজ্ঞান’ চর্চা ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রায় দুই যুগ ধরে। আর এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তুলেছেন ল্যাব। সেই ল্যাবেই প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে মুখস্থ ছাড়াই ডিভাইসের মাধ্যমে শিখছে পদার্থবিজ্ঞান।

জানা গেছে, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কুপা গ্রামের শিক্ষক তবিবর রহমানের তৃতীয় ছেলে ফরিদুল ইসলাম। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও আগ্রহের কমতি নেই বিজ্ঞানচর্চায়। কিশোর বয়স থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তার। তার সরল মনে রেখাপাত করেছিল পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো, সূত্রগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখতে দাখিল পাস করে আবার বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। স্কুলে বিজ্ঞান বইয়ে ডিভাইসের ছবি ও ব্যাখ্যা থাকলেও বাস্তবে দেখতে পারেননি, ছবিগুলোর বাস্তব প্রয়োগ দেখতে আগ্রহ বেড়েই চলে তার। এইচএসসি পাস করলেও সেই সূত্রগুলোর বাস্তবতা তিনি দেখতে পারেননি। খাবারের টাকা থেকে জমিয়ে ডিভাইস কিনে শুরু করেন গবেষণা। ২০০০ সালে নিজ বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা করেন ইজি ইনডাকশন ল্যাব। শুরুতে ডিভাইস সংখ্যা কম থাকলেও এখন ৪০ লাখ টাকার সরঞ্জাম রয়েছে তার ল্যাবে।

বিজ্ঞানপ্রেমী ফরিদুলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয়সহ স্ত্রীর গয়না ও কিছু জমি বিক্রির টাকায় ব্যয় করেছেন ল্যাবের সরঞ্জাম কিনতে। স্কুলে পড়তে যা শিখতে পারেননি, তাই হাতে-কলমে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শেখাচ্ছেন তিনি। মুখস্থ না করে ডিভাইসের মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞান শিখে শিক্ষার্থীরা যেমন উপকৃত, তেমনি শিক্ষকরাও আসেন এই ল্যাবে। গত বছর পদার্থবিজ্ঞান মেলাও করেছেন। তিনি এবারও সেই আয়োজন রয়েছে।

ইজি ইনডাকশন ল্যাবে কথা হয় ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে। ফরিদুল বলেন, ‘সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিজ্ঞান বইয়ে কিছু কিছু ডিভাইসের ছবি এবং এর ব্যাখ্যাও দেওয়া থাকত। তখন আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করতাম স্যার যে ছবি দেওয়া আছে এই জিনিসটা বাস্তবে দেখতে চাই, তখন স্যাররা সঠিকভাবে বলতে পারতেন না। মাদ্রাসার নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বইয়ে বিদ্যুৎ সম্বন্ধে আলোচনা ছিল। সেই অধ্যায় পড়ার সময় বাস্তবে প্রয়োগ দেখতে না পেয়ে দাখিল পাস করার পর হাইস্কুলে আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন বিজ্ঞান শিখতে। কিন্তু সেখানেও তা দেখা হয়নি। এরপর নিজেই ল্যাব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আরও জোর দেন যেন পরবর্তী প্রজন্ম বিজ্ঞান শিক্ষাটা সহজে পায়।’

ফরিদুল পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তার ৭৫ শতাংশই তিনি ল্যাবের পেছনে ব্যয় করেন। এই ল্যাব আরও বড় করতে চান তিনি। শুরুতে মাত্র ৩-৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও এখন তার ল্যাবে ২৭৫ জন শিক্ষার্থী। প্রতি শুক্র ও শনিবার পদার্থবিজ্ঞান শিখতে এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকরাও আসেন তার ল্যাবে। তাই ল্যাবের পরিধি বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আবদুল আলীম জানান, এটা একটা অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান, এই এলাকার শিক্ষার্থী ছাড়াও অনেক শিক্ষক এই ল্যাবে আসেন। এখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা পাচ্ছে।

স্কুলশিক্ষার্থী মরিয়ম সনি, মাহবুবা জেরিন, ফাহমিদা, শিহাব, রাহাত জানান, এই ল্যাবে তারা বিনামূল্যে হাতে-কলমে শিক্ষা পাচ্ছে। এখানে ডিভাইসের মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে। এতে তাদের মুখস্থ করতে হয় না। তারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলও করেছে।

সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ বগুড়ার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেলিমুজ্জামান জানান, তিনি শিবগঞ্জে ফরিদুলের ল্যাব দেখেছেন। তার ল্যাবে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে হচ্ছে না, তারা হাতে-কলমে শিক্ষা পেয়ে সৃজনশীল হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলছে। ল্যাবটি অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত