আমাদের শোকের আয়ু বড়জোর এক ইস্যু থেকে আরেক ইস্যু

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ১২:৩১ এএম

সেই গল্পটা মনে হয় সবারই জানা। এক অত্যাচারী রাজা একবার প্রজাদের বলেছিলেন, তোমাদের সামনে শুভদিন। ধরো আর বছর বিশেক অত্যাচার সহ্য করলেই হয়ে যাবে। আশাবাদী প্রজারা শুধায় মহারাজ, এরপর কি অত্যাচার বন্ধ হয়ে যাবে? না, তদ্দিনে তোমাদের এসব গা-সওয়া হয়ে যাবে।

বেইলি রোডের আগুনে আস্ত একটা অট্টালিকা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া আর তাতে প্রায় অর্ধশত মানুষ অঙ্গার হয়ে এই ধরাধাম ছেড়ে যাওয়ার খবরটা রাতেই শুনেছিলাম। শুরুতে ভীষণ বিক্ষিপ্ত লাগলেও, ঘুমের আগে এপাশ ওপাশ করে আর আগুনের হলকা গায়ে এসে লাগার বোধটা টের পেলেও সাপ্তাহিক ছুটির আগের রাতটা ভালোই ঘুম হলো।

ঘুম ভেঙে দেখি সামাজিক মাধ্যমে মাতম। সম্ভবত আমার মতোই বেশির ভাগ শিক্ষিত, আরবান মধ্যবিত্তরা এক ঘুম দিয়ে এই মর্সিয়া ক্রন্দনে লিপ্ত হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যম আর গণমাধ্যমে আজ এই সংবাদের ভীষণ কাটতি। কে কত অ্যাঙ্গেল বের করে কাঁদাতে পারেন, মৃত্যুকে রোমান্টিসাইজ করার তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সবাই।

কিছুটা আশ্চর্যেরই। আমাদের তো এতদিনে সয়ে যাওয়ার কথা। মানলাম, বেইলি রোডের আগুনটায় আমাদের মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই বেশি মরেছে।  কাছের, একটু দূরের, তস্য দূরের মানুষদেরও পাওয়া যাবে। কিন্তু এই হত্যাকান্ড কি অস্বাভাবিক? এ রকম গণহত্যা যে এ দেশে প্রতিদিন হয় না, এই নিয়েই কি বরং আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত না?

‘হত্যাকান্ড’ বলাতে কেউ হয়তো নড়েচড়ে বসবেন। কেউ কেউ প্রতিবাদও জানাতে পারেন। কিন্তু এই বেইলি রোডে যা হলো তাকে যদি হত্যাকান্ড না বলা হয়, তবে হত্যার সংজ্ঞা বদলাতে হবে। ঠান্ডা মাথায়, জেনেশুনে একপাল মানুষকে নিয়মিত মৃত্যুকূপে ঠেলে দেওয়ার পর যদি বলা হয় এদের মৃত্যু দুর্ঘটনা। তবে তা শুধু মিথ্যা না, হত্যাপুরীর পরিবেশ জিইয়ে রাখার প্রথম শর্ত।

শুধু হত্যাকান্ড বলেই কি খালাস? আমাদের এখনো বেদনা আছে, আমরা এখনো সব অনুভূতি হারায়ে ফেলিনি এই কথাই কি যথেষ্ট? এমনও তো হতে পারে, এই শোক দেখানোও আসলে নিজের অক্ষমতার একটা ঢাল মাত্র। নিজের বিবেককে প্রশমন করা, সমাজের আর দশজনকে দেখান যে, দেখো দেখো আমি কত অনুভূতিওয়ালা মানুষ!

নাজিম হিকমত বলেছিলেন ‘বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর’। উনি জানতেন না একবিংশ শতাব্দীতে নেটিজেনদের শোকের আয়ু বড়জোর সামনের ইস্যু পর্যন্ত। তেতাল্লিশটা কিমা হওয়া লাশকে ঢেকে দেবে হয়তো একটা ক্রিকেট খেলা কিংবা একজন টিকটকার। কিন্তু এখানে শোকটাও ট্রেন্ডি। সবার সঙ্গে গা মিলিয়ে শোক দেখানোও একটা ফাঁপা ট্রেন্ড। দায়িত্ব শেষ। অথচ এই শোকটা পরিণত হতে পারত ভীষণ শক্তিতে। প্রচন্ড একটা আঘাতে। নিটশে নামক এক কঠোর জার্মান দার্শনিক ছিলেন। তিনি উবারমানশ বা অতিমানুষ তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। নির্দয় বলেই এই ভদ্রলোকের দুর্নাম ছিল। অথচ একটা বেতো ঘোড়াকে নির্যাতন করা হচ্ছে, এই দেখে ভদ্রলোক এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে, তিনি মূঢ় হয়ে গেছিলেন। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আর স্বাভাবিক হননি।

আর আমরা! সারি সারি কিমা হওয়া লাশ দেখে কেবল ফেসবুকে একটা জ্বালাময়ী লেখা লিখেই খালাস। অপেক্ষা করি, পরের ঘটনাটার জন্য। আমরা খুব জ্ঞানী। আমরা পরিসংখ্যানের বিগ নাম্বার থিওরামকে অন্তরে ধারণ করি। আমরা জানি, গোটা দেশ একটা মৃত্যুকূপ। আমরা জানি, বাসা থেকে বের হওয়ার পর আবার বাসায় নিরাপদে ফিরতে পারা যে কোনো সার্ভাইভাল কম্পিউটার গেমসের চেয়েও অনেক বেশি থ্রিলিং।

বাসা থেকে বের হওয়ার পর নির্মাণাধীন কোনো উঁচু ইমারত থেকে ইট উড়ে এসে আমার মাথায় পড়েনি, রাস্তায় নিয়মের তোয়াক্কা না করা বিশাল ক্রেন ওপরে ভেঙে পড়েনি। ঘাটে ঘাটে পয়সা মেরে শেষতক নিম্নমানের ফুটওভার ব্রিজ বা রাস্তা ভেঙে আমি মরিনি। লাইসেন্সবিহীন বেপরোয়া বাস ড্রাইভার কিংবা ধনীর মদ্যপ সন্তানের গতির নেশায় থাকা গাড়ির নিচে পড়িনি। ঘুষ খেয়ে আর ক্ষমতার দাপটে সেফটি নেট না থাকা সত্ত্বেও নির্মাণ করা বিপুল ইমারতে আগুন লাগেনি বা ভেঙে পড়েনি। আরও কত কত মৃত্যুফাঁদ।

সত্যি বলতে, যারা কম্পিউটার গেমস বানান, তারা যদি আমাদের জীবনের এসব নিয়ে গেম বানান, তবে সেটা একটা অসম্ভব গেম বলে খারিজ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমরা এই ভরসায় বাঁচি যে, হলে অন্যজনের হবে। বিশ কোটি লোক তো আর একসঙ্গে মরবে না। আমরা নরকের নানা বিবরণ শুনি, কিন্তু কোন নরকে মানুষের মানসিকতার এ রকম বিকৃতি হয়ে যাওয়ার, বিকৃত করে ফেলার গল্প মিথের লেখকরাও লিখতে পারেনি। কিন্তু এসবই তো পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আমরা এই শোকের দিনে রোমান্টিক গল্প না ফেঁদে মূল প্রশ্ন করতে পারতাম। যদ্দিন ঘুষ আর ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে এসব স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাদের মরতেই হবে। যারা এসব করে পার পেয়ে যান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিতে হবে।

আমরা জানি, যারা এসব মৃত্যুফাঁদ বানান তারা অর্থবিত্তে ফুলে ফেঁপে ওঠেন। আমরা এই শোকের দিনে প্রতিজ্ঞা করতে পারতাম, এসব খুনিদের আমরা যদি প্রতিহত করতে না পারি অন্তত বর্জন করব। যেনতেন প্রকারে টাকা আর ক্ষমতা উপার্জন করে যারা ধনী হন আমরা তাদের বয়কট করব। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আগাপাশতলা পরিবর্তন করা, ইনসাফ আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের এই সামাজিক আন্দোলন করা ভীষণ জরুরি।

কিন্তু আমরা শোক কেটে যেতেই সেই খুনিদের মতোই হতে চাইব। সমাজ আমাদের শেখাবে পয়সা কামাও, ক্ষমতা কামাও। তুমি সেলাম পাবে। এদের থুথু দেওয়ার বদলে সমাজ এদের মাথায় তুলে রাখবে। আমরা মানিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবো। নির্লিপ্ত হওয়ার সাধনা চালিয়ে যাব। অন্ধ সেজে প্রলয় বন্ধ আছে এই আশ্বাস দেব। তবু এই শোকের দিনে হয়তো কোনো কবি গেয়ে যাবেন  ‘ক’বার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে/বলবে তুমি দেখছিলে না তেমন ভালো করে/কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে/বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।’

লেখক : সাংবাদিক 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত