জ্ঞান বেশি হাতেকলমে

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

কম্পিউটার, ট্যাব, স্মার্টফোন আর সর্বশেষ চ্যাটজিপিটির যুগে এসেও বিজ্ঞানীরা বলছেন হাতে কলমে লিখলে বেশি জ্ঞান হয়। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

পৃথিবীটা এখন এ অবস্থায় পৌঁছেছে যে, চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসায় কাগজ ও কলমের ব্যবহার একেবারেই কমে গেছে। মানুষ এখন চর্চা করছে ‘পেপার ফ্রি’ অফিস ব্যবস্থা। কম্পিউটারে লেখার কিবোর্ড শুধু নয়, ভয়েজ কমান্ডের প্রযুক্তি পেরিয়ে এখন শুরু হয়েছে চ্যাটজিপিটির যুগ। কয়েকটি শব্দ দিলেই এ প্রযুক্তি শত শত শব্দ উৎপাদন করে দিচ্ছে। এ প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত করতে বিজ্ঞানীরা সচেষ্ট। তারপরও তারা বলছেন হাতে-কলমে লিখলে তা বেশি মনে থাকে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়।

সাম্প্রতিক এক গবেষণার পর বিজ্ঞনীরা বিষয়টি আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। যারা হাত দিয়ে লেখেন তাদের সক্রিয়তা, গভীরে দেখার ক্ষমতা, সংবেদনশীলতা এবং স্মৃতিশক্তিকে ধারণ করে মস্তিষ্কের এমন অঞ্চল অধিক কার্যকর হয়ে ওঠে। গবেষকরা শিশুদের হাত দিয়ে শব্দ লেখা, ছবি আঁকা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

গবেষণা

নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এনটিএনইউ) অড্রে ভ্যান ডের মির এবং রুড ভ্যান ডের উইলের নতুন প্রতিবেদন ২০১৪ সালের একটি মৌলিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এনটিএনইউর নিউরোসাইকোলজির অধ্যাপক ভ্যান ডার মির বলেন, এ গবেষণায় আমরা দেখেছি, কম্পিউটারে নোট যারা নেন তারা চিন্তা না করেই টাইপ করেন। প্রভাষক যা বলছেন তা হুবহু টাইপ করা খুব সহজ। প্রভাষক বা লেকচারারের কথা শ্রোতার কানের মধ্য দিয়ে যায় এবং আঙুলের ডগা দিয়ে বেরিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে শ্রোতা তার কানে শোনা তথ্য বিষয়ে কিছু ভাবেন না। কিন্তু কাগজে-কলমে নোট নেওয়ার সময়, সব লিখে রাখা প্রায়ই অসম্ভব। এ জন্য শিক্ষার্থীদের তথ্যের প্রতি সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিতে হয়। তখন তারা ভাবে, এ তথ্য প্রক্রিয়া করতে হবে। গোটা তথ্যের ভেতর কোনোটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তথ্যগুলোকে একীভূত করতে হবে এবং তারা আগে যা শিখেছে তার সঙ্গে একে সম্পর্কিত করার চেষ্টাও চালায়। তথ্য সাজানোর এ সচেতন ক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ধারণার বিকাশ ঘটতে পারে।

২০১৪ সালের ৩৬ শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষকরা এসব শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণও করেন। তারা এ গবেষণার প্রয়োজনে ১৫টি শব্দ ব্যবহার করে। যখন শিক্ষার্থীরা হাত দিয়ে শব্দগুলো লেখে, তখন তাদের সঙ্গে যুক্ত সেন্সর থেকে দেখা যায়, মস্তিষ্কের অনেক অঞ্চলে ব্যাপক সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। অথচ কম্পিউটারে টাইপ করার সময় মস্তিষ্কের ওই এলাকায় ন্যূনতম কার্যকলাপ হয়। আর হাতে লেখার ফলে মস্তিষ্কের কল্পনা করতে সক্ষম এমন অঞ্চল আরও বিস্তৃত হয়।

ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক সোফিয়া ভিঞ্চি বুহার বলেন, ‘যখন আপনি টাইপ করছেন, তখন প্রতিটি অক্ষর তৈরিতে আপনার আঙুলের একই সরল নড়াচড়া ঘটে। আর আপনি যখন হাত দিয়ে লিখছেন, তখন ‘এ’ তৈরির শারীরিক অনুভূতি ‘বি’ তৈরির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়। তিনি বলেন, শিশুরা একটি ডিজিটাল ট্যাবলেটে ট্যাপ করে পড়তে এবং লিখতে শিখছে। যে কারণে প্রায়ই তাদের অক্ষর আলাদা করতে অসুবিধা হয়। কারণ কিছু অক্ষর আছে দেখতে একে অপরের মতো বা একে অপরের মিরর ইমেজ, যেমন ইংরেজি ‘বি’ এবং ‘ডি’।

তিনি আরও বলেন, আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে, হাতে লেখা মস্তিষ্কের যান্ত্রিক কাজ এবং সংবেদনশীল ব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করে। আপনি যখন একটি চিঠি বা একটি শব্দ লিখছেন, তখন আপনি বোঝাপড়ার প্রয়োজনে মস্তিষ্কের যান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছেন। এরপর সেই শব্দ বা অক্ষরের ইমেজ ভিজ্যুয়াল সিস্টেমে (মস্তিষ্ক যেখানে ইমেজ দেখে থাকে) পাঠানো হয়। সেখানে শব্দটি আবার প্রক্রিয়া করা হয়। আপনি যখন আপনার কল্পনা থেকে কিছু বাস্তবায়িত করেন (লিখে বা এঁকে), তখন কল্পিত ধারণাটি শক্তিশালী হয়। পরে যা স্মৃতিতে আটকে থাকে।

অন্টারিওর ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানের ছাত্র যদুর্শানা শিবশঙ্কর বলেছেন, টাইপ করার চেয়ে হাতের লেখার জন্য মস্তিষ্কের মোটর প্রোগ্রাম বেশি প্রয়োজন। যখন আপনি ইংরেজি ‘দ্য’ শব্দটি লিখছেন, তখন হাতের নড়াচড়া শব্দের কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। তথ্য যখন আপনি লিখবেন তখন আপনাকে সে সম্পর্কে চিন্তা করতে হয় এবং আপনাকে অর্থপূর্ণ কিছু তৈরি করতে হয়। হাতের লেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিশাল স্নায়ু নেটওয়ার্কের আন্তঃসংযোগগুলো বিস্তৃতভাবে ক্রিয়াশীল থাকে।

শিশুদের জন্য

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যখন তাদের আঙুল এবং হাত দিয়ে অক্ষর তৈরি করে বা আঁকে তখন তারা আরও ভালোভাবে শিখতে পারে। যা মাউস ক্লিক করে বা বোতাম ট্যাপ করে করা যায় না। গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে, হাতের লেখার ক্রিয়া পড়া বা পর্যবেক্ষণের তুলনায় বিভিন্ন স্তরে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলকে জড়িত করে। গবেষণা দেখিয়েছে যে, হাতের লেখা অন্যান্য শেখার অভিজ্ঞতার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হয়।

ভ্যান ডের মির বলছেন, নরওয়ের কিছু কর্মকর্তা সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্কুল বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, সেখানে প্রথম শ্রেণির শিক্ষকরা তাকে বলেছেন খুব কম ছাত্র জানে কীভাবে পেনসিল ধরতে হয়।

গবেষক ভিঞ্চি বুহার বলেছেন যখন প্রি-স্কুল এবং কিন্ডারগার্টেনে শিশুরা আঁকা এবং হস্তাক্ষরের মাধ্যমে প্রথমবার অক্ষর সম্পর্কে শিখছে তখন তা তাদের ভালোভাবে মনে থাকছে।

ডয়চে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে পাঠদান প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে অ্যানিমেটেড মুভি দেখানো, শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহার, যার অনেকটিতে সফল হলে পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে, ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষ ও চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের কারণে শিশুদের সাক্ষরতা ও সংখ্যাতাত্ত্বিক দক্ষতা বাড়ে, বিভিন্ন কাজে দক্ষতার সহিত হাত ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ে এবং কোনো জিনিস চেনা ও সেগুলোর অবস্থান কোথায় তা মনে রাখার সক্ষমতা বাড়ে। এসব কারণে শিশুদের শিক্ষাগ্রহণ ও ভাষা শেখার দক্ষতা বাড়ে, গণিত, বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে মেধা বাড়ে এবং সেই সঙ্গে কারিগরি জ্ঞান ও সৃজনশীলতাও বাড়ে। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটার শিশুদের মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাব স্বল্প নাকি দীর্ঘমেয়াদি, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গবেষণায় এমনও জানা গেছে, অতিরিক্ত কম্পিউটার ব্যবহার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে এর জন্য সম্ভবত যতটা না কম্পিউটার দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী দীর্ঘসময় ধরে কম্পিউটারে বসে থাকা। সে কারণে বাইরে গিয়ে দৌড়ানো কিংবা বলে লাথি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও শিশুর উন্নয়ন ও তাদের লেখাপড়ার মানোন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গ্রাফোলজি’র মাধ্যমে ব্যক্তির হাতের লেখা দেখে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা করা। হাতের লেখার অনেক লাইন অনুসরণ করতে হয়, এর মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির দেহভঙ্গি ও মেরুদণ্ডের কোনো সমস্যা থাকলে তা বোঝা যায়। লেখার খাড়া লাইন যদি আঁকাবাঁকা বা ঢেউখেলানো হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ব্যক্তির মেরুদণ্ডের কোনো ত্রুটি রয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের কিন্ডারগার্টেন ও প্রথম শ্রেণিতে হাতের লেখা শেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশুদের এখন হাতের লেখা শেখানো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএসসি রসিয়ার স্কুল অব এডুকেশন’-এর শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মরগান পোলিকফ বলেন,  কিছু শিশুর হয়তো মস্তিষ্কের মোটর অংশে সমস্যা রয়েছে। তাই তাদের জন্য হাতে লেখা চ্যালেঞ্জিং হবে। অন্যদিকে হাতে লেখা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশি সুবিধা দেয়, এমন প্রমাণও মিলেছে।

স্বাস্থ্য

অন্যদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ডটকমে ভারতের ‘দ্য লোগো গুরু’র প্রতিষ্ঠাতা সুধীর কোভ বলেন, আঙুলের ছাপের মতো হাতের লেখাও নিজস্ব হয়। ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও হাতের লেখার সম্পর্কে রয়েছে। হাতে লেখা নথি দেখে ব্যক্তির মানসিক, স্বাস্থ্য এবং চিন্তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সুধীর বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, অসুস্থতার কারণে ব্যক্তির হাতের লেখায় পরিবর্তন হয়।

বিভিন্ন সময়ে গবেষকরা বলছেন, মানুষের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো বর্ণমালা। যার মাধ্যমে তারা মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। আর এর শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। কারণ আদিকালে মানুষকে লিখতে হয়েছে পাথর খোদাই করে। ক্রমে তা আরও সহজ হয়ে ওঠে। এরপর মানুষ কাগজে-কলমে লিখতে শুরু করে। ছাপাখানা আবিষ্কার মানুষকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর আরও প্রযুক্তি আসতে থাকে। লেখা থেকে সরে বসতে থাকে মানুষ। বিভিন্ন ডিভাইস হয়ে ওঠে লেখার উপকরণ। তবে মানুষের শরীরবৃত্তিতে এখনো লেখার সেই কার্যকারিতা রয়ে গেছে। যার কারণে লেখালেখি এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে মানুষকে সক্রিয় এবং সতেজ রাখে। যদিও বিজ্ঞান এতদূর চলে গেছে যে, মস্তিষ্ককে এখন আর আগের মতো অনেক কিছু মনে রাখতে হয় না। স্মৃতি, তথ্য জমিয়ে রাখার জন্য অনেক উপায় এখন আছে মানুষের সামনে।

কিন্তু এরপরও হাতে লেখার যে মাজেজা, তা অটুট আছে। যত হাতে লিখবে মানুষ, তত তার সংবেদ, চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা সক্রিয় থাকবে। মানুষ তখন বিভিন্ন ঘটনা থেকে নতুন নতুন উপমার জন্ম দিতে পারবে। ফলে শুধু বিজ্ঞাননির্ভরতা নয়, মাঝে মাঝে পুরনো পদ্ধতিকেও কাজে লাগানো জরুরি। যার মাধ্যমে মানুষ তার মানসিক বিকাশ অব্যাহত রাখতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত