যুদ্ধবিরতিতে সময়ক্ষেপণ মানে ফিলিস্তিনি হত্যার বৈধতা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৮:২৭ এএম

গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের চার মাসের বেশি অতিক্রান্ত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের বর্বর হামলায় নিহত হয়েছে। সাধারণ এই ফিলিস্তিনিদের একটা বড় অংশই নারী ও শিশু। ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী যার মধ্যে রয়েছে ১৩ হাজারের বেশি শিশু, ৮ হাজার ৮শ নারী। এই সংঘাতে ন্যূনতম ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে যার মধ্যে ১১ হাজার মারাত্মকভাবে।

এই দীর্ঘসময়ে গাজার ওপর ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ফিলিস্তিনিদের, বিশেষ করে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা কেবল বাড়িয়ে তুলছে। আবার ইসরায়েলের অর্জনের জায়গা এতটুকুই যে সেখানে হাজার হাজার সাধারণ ফিলিস্তিনি লাশে পরিণত হয়েছে; কিন্তু হামাসকে নির্মূল করার লক্ষ্য এখনো অধরাই রয়ে গেছে এবং এই লক্ষ্য কবে অর্জিত হবে তা ইসরায়েল নিজেও জানে না। যদিও ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য কী হামাস নির্মূল না ফিলিস্তিনিদের নির্মূল তা নিয়ে প্রশ্ন করা কোনো ভাবেই অযৌক্তিক হবে না।

হাজার হাজার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বব্যাপী গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি ধীরে ধীরে আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। না চাইলেও গাজা যুদ্ধ এখন ইসরায়েলের জন্য শুধু তার ক্ষমতার ঔদ্ধত্য দেখানোর ক্ষেত্র না নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন, যেমনটা ইসরায়েল নিজেও দাবি করে। সেই প্রশ্নের কানাগলিতে ইসরায়েল নিজেই ঢুকে পড়েছে। প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় এত সংখ্যক সাধারণ ফিলিস্তিনিকে হত্যার পর না হামাস, না গাজার সুড়ঙ্গ, কোনোটারই যেন কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না ইসরায়েল। ফলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আশার পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নেতানিয়াহু তার রাজনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য কি ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও নৃশংসতা চাপিয়ে দেবে? হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে হামাসকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় যে বাস্তবায়িত হচ্ছে না তা সহজেই অনুমেয়। এমন অবস্থায় ইউরোপের দেশগুলোর অনেকেই এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে জনমত বাড়ছে। যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে মার্কিন বিমান বাহিনীর এক সদস্য, ২৫ বছর বয়সী অ্যারন বুশনেল ইসরায়েলের দূতাবাসের সামনে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে মুক্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে দাবি উত্থাপন করে অমর হয়ে গেছেন। এই ঘটনার প্রভাব কতটুকু মার্কিন রাজনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ওপর পড়ে তাই এখন দেখবার বিষয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতির খুব কাছাকাছি আছি। তবে এখনো আলোচনা শেষ করিনি। আমার প্রত্যাশা, আগামী সোমবারের মধ্যেই আমরা যুদ্ধবিরতি করব।’ তবে আপাতদৃষ্টিতে বাইডেনের সেই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে জোরালো অনিশ্চয়তা। যদিও যুদ্ধবিরতি নিয়ে কাতারে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলের মধ্যকার দেনদরবার একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি হতাশার দিকও আছে ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এর আগে গত বছরে নভেম্বরে একটি স্বল্প সময়ের জন্য হামাস ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব কার্যকর হয়। সে সময় দুপক্ষের মধ্যে বন্দিবিনিময় করা হয়। সেই বন্দিবিনিময় চুক্তির পর ইসরায়েল আবার তার সর্বশক্তি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় জাতিসংঘের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিরোধী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করার কারণে তা ভেস্তে যায়। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা পরিষদে এরকম একটি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেটো প্রদান করে। আবার এর সপ্তাহের একটু বেশি সময়ের পরে প্রেসিডেন্ট বাইডেন নতুন যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছেন। একদিকে ভেটো প্রদান অন্যদিকে যুদ্ধ বিরতির সম্ভাবনার জানান দেওয়া নিশ্চয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উভয় সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ভেটো তার মিত্রদের মধ্যেও হতাশার জন্ম দিয়েছে। পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যে ১৩টিই আলজেরিয়ার প্রস্তাবিত খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ভোটদানে বিরত ছিল আরেক স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য। আলজেরিয়ার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেওয়ার পর জাতিসংঘে উত্তর আফ্রিকা দেশগুলোর প্রতিনিধি বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত নিরাপত্তা পরিষদ আবারও ব্যর্থ হয়েছে।’

এর আগে গত বছর ৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত আরেকটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত রবার্ট উড নিরাপত্তা পরিষদের উত্থাপিত সেই প্রস্তাবনাকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সেই সময় জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেছিলেন, ‘হামাসের নৃশংসতার কারণে ফিলিস্তিনি জনসাধারণের ওপর নেমে আসা শাস্তি কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।’

অন্যদিক ৩০ হাজার মানুষের নিহত হওয়ার পরও ইসরায়েল রাফায় স্থল অভিযানের হুমকি দিয়ে রেখেছে। এই রাফাতেই প্রায় পনেরো লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি যুদ্ধের কারণে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। রাফাহ হচ্ছে জরুরি খাদ্য ও ওষুধ সামগ্রী সরবরাহের প্রবেশ পথ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র রাফা শহরে আগ্রাসন না করার জন্য এর আগে ইসরায়েলকে সতর্কও করেছে। রাফা আক্রমণ বর্তমান মানবিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে নিঃসন্দেহে। রাফা আক্রমণ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে আরও পিছিয়ে দেবে বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা গ্রহণকারী দেশ মিসর ও কাতার। জাতিসংঘের সূত্র মতে গাজায় এই মুহূর্তে প্রায় ছয় লাখ অধিবাসী দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি যা গাজার মোট জনগোষ্ঠীর চার ভাগের একভাগ। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি গাজার ত্রাণের জন্য অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে এবং এই ঘটনায় ন্যূনতম ৭০ জন সাধারণ ফিলিস্তিনি নিহত হয়।

সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, গত রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস গাজায় আশু যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে ‘গাজার ভয়াবহ ভোগান্তির মোকাবিলায় এই মুহূর্তে পরবর্তী ছয় সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি দরকার, এই বিষয়গুলো এখন আলোচনার টেবিলে আছে।’ জাতিসংঘের বারবার যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া সত্ত্বেও মার্কিন রাজনীতিবিদদের এই প্রচেষ্টা বেশ আগ্রহের উদ্রেক করে। ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতি ইস্যু এই মুহূর্তে মার্কিন রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই মুহূর্তে ইসরায়েল ইস্যু একটি উভয় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিকে মার্কিন নির্বাচনে ইসরায়েল লবি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক, অন্যদিকে ইসরায়েলের ওপর বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নিঃশর্ত সমর্থন মার্কিন ভোটারদের একটি অংশকে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি বিমুখ করেছে। যার দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে সম্প্রতি মিশিগান রাজ্যের ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাইমারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে। মিশিগানকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি দোদুল্যমান রাষ্ট্র হিসেবে ধরা হয়। যেখানে এবার এক লাখের বেশি ভোটার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি ‘অঙ্গীকারাবদ্ধ’ নয় এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন। বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মিশিগানে ২০২০ সালে জো বাইডেন মাত্র দেড় লাখ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন অপরপক্ষে ২০১৬ সালে জো বাইডেন এই রাজ্যে মাত্র এগারো হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। 

দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধবিরতির একদিন দেরি হওয়া মানে আরও কয়েক ডজন অসহায় ও নিরীহ ফিলিস্তিনির জীবন অকাতরে বিলীন হয়ে যাওয়া। বিশ্বের তাবৎ শান্তিকামী জনগোষ্ঠী আজ গাজায় ইসরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তারপরও ইসরায়েল বিশ্ব জনমতকে যে তোয়াক্কা করে না তা তাদের আচরণেই বোঝা যায়। অধিকন্তু শান্তি প্রক্রিয়া অনেকগুলো ‘যদি, ‘কিন্তু’র ওপর নির্ভরশীল। এখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রাণসংহার কোনো কিছুই যেন যথেষ্ট না। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর এই শান্তি প্রক্রিয়ার অনেকাংশে নির্ভর করছে। তবে ইসরায়েলের জন্যও যুদ্ধবিরতি দরকার। কারণ ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনিদের ওপর একই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রাখে তাহলে তা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করতে পারে। আজ যে ২৫ বছর বয়সী মার্কিন যুবক মুক্ত ফিলিস্তিনের জন্য আত্মবিসর্জন দিয়েছে তার চেতনা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুবকদের মধ্যে একটু হলেও ছড়িয়ে পড়ে তার প্রভাব পড়বেই মার্কিন রাজনীতিতে। আর সেই প্রভাবে ইসরায়েল হয়তো তার সবচেয়ে বড় মিত্রকে হারাতে পারে। ইসরায়েল ও বর্তমান মার্কিন প্রশাসন উভয়ের জন্য এই মুহূর্তে যুদ্ধ বিরতিই হচ্ছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। আর তা না হলে ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের প্রাণ হারানোর দায় তাদের নিতে হবে। পাশাপাশি ইসরায়েল ও বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইতিহাসের কাছে মুখ লুকাতে পারবে না। তবে তার থেকেও বড় বিষয় অনেকগুলো নিরীহ ফিলিস্তিনির জীবন বাঁচবে। আর সেটাই দরকার সবার আগে কোনো ধরনের যুক্তিতর্ক ছাড়াই।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত