সংবিধান বলে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক যখন অপঘাতে মৃত্যুকে বরণ করেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন কিংবা অবহেলা, রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভুল, কারও অসচেতনতায় ক্ষতিগ্রস্ত হন তখন তার দায় নেয় না কেউই। ভুক্তভোগী বা তার পরিবার ক্ষতিপূরণ চাইতে আইনের দ্বারস্থ হবেন সে সুযোগও নেই। আইনে যেটুকু সুযোগ আছে, তাতে ক্ষতিপূরণ পেতে গুনতে হয় প্রতীক্ষার দীর্ঘ প্রহর।
গত তিন দশকে দেশের আলোচিত ২৩টি ক্ষতিপূরণ মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ক্ষতিপূরণ পাননি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সুনির্দিষ্ট আইন না থাকা, টর্ট আইন বিধিবদ্ধ না হওয়া, আইনের প্রয়োগের ঘাটতি, প্রভাবশালীদের তৎপরতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয় ভুক্তভোগীদের।
সড়ক, রেল ও নৌ-দুর্ঘটনা বলা যায় নিত্যদিনের ঘটনা। এ ছাড়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, চিকিৎসায় অবহেলা, অগ্নিকাণ্ডে, ভবন থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে, ভবন ধসে, খোলা ম্যানহোল ও নালায় পড়ে মানুষের মৃত্যু, অঙ্গহানির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। নামের মিলে কারাবাস, ‘ভুল’ আসামি হিসেবে বিচারে সাজার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে। অনেকের মৃত্যু বা অঙ্গহানিতে পরিবার পথে বসে।
এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায় ও অবহেলা সরকারি, বেসরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও বাস্তবতা হলো, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণে এগিয়ে আসে না কেউ।
গত তিন দশকের বেশি সময়ে আলোচনায় এসেছে এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে অধস্তন ও উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে এমন ২৩টি মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯টি মামলায় ভুক্তভোগী পরিবার বা ভুক্তভোগী নিজে কিছুই পাননি। এর মধ্যে বেশ কিছু মামলায় ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে রুল বিচারাধীন। দুটি মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের পরও ক্ষতিপূরণ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। সাতটি মামলায় ক্ষতিপূরণ আটকে আছে আপিলে। আর চারটি মামলায় কিছু অর্থ পেয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার।
ক্ষতিপূরণ পেতে শুধুই অপেক্ষা
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে ১ হাজার ১৩৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় একই বছরের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। ২০১৪ সালে কমিটি নিহত, নিখোঁজ ও স্থায়ীভাবে পঙ্গু শ্রমিকদের ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আঘাতের ধরন অনুযায়ী আহতদের দেড় লাখ থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করে। প্রায় ১১ বছর অতিবাহিত হলেও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আজও নিষ্পত্তি হয়নি।
১৯৮৯ এর ৩ ডিসেম্বর রাজধানীর শান্তিনগরে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় মারা যান দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু (মৃত্যুর সময় ৪৪ বছর)। ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার একটি দেওয়ানি আদালতে তার স্ত্রী রওশন আখতারের করা মামলায় ২০০৫ সালের ২০ মার্চ মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় হয়। ২০১০ সালের ১১ মে হাইকোর্ট রায়টি কিছু সংশোধন করে ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। প্রায় আট বছর আগে আপিল বিভাগেও মন্টুর পরিবারের পক্ষে রায় হয়। তবে মামলার ৩৩ বছরেও ক্ষতিপূরণ বুঝে পায়নি মন্টুর পরিবার। এ নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় কার্যকর করতে ঢাকার একটি দেওয়ানি আদালতে মানি এক্সিকিউশন (অর্থ আদায়) মামলা আট বছর ধরে বিচারাধীন।
২০০৩ সালে ৮ জুলাই ‘এমভি নাসরিন’ নামে একটি লঞ্চ চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায় ডুবে ১১০ জন মানুষ নিহত ও প্রায় ২০০ জন নিখোঁজের ঘটনায় ব্লাস্টের করা মামলায় প্রথমে ঢাকার সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালত ও পরে হাইকোর্টের রায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১২১টি পরিবারকে ১৭ কোটি ১১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের দিতে বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চমালিকদের নির্দেশ ছিল। তবে ২১ বছর পার হলেও আপিল বিভাগে থাকা এ মামলার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
১২ বছরের বেশি সময় আগে মানিকগঞ্জের ঘিওরের জোকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের সিইও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টের রায়ে তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশের রায়ের বিরুদ্ধে পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির আপিল এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। আর মিশুক মুনীরের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের মামলাটি এখনো হাইকোর্টে শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
পুলিশের ভুলে মাদকের মামলায় ভুল আসামি হিসেবে ১০ বছরের সাজা নিয়ে পাঁচ বছর কারাগারে ছিলেন মিরপুরের বেনারসি পল্লীর আরমান। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল এখনো বিচারাধীন।
তবে কিছু ব্যতিক্রমের মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের রেষারেষিতে আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিম নামে দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে উচ্চ আদালতের আদেশে ৫ লাখ টাকা করে দেয় বাস কর্তৃপক্ষ। ৯ বছর আগে রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনিতে পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পায় জিহাদের পরিবার। প্রায় ছয় বছর আগে রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো রাসেলকে হাইকোর্টের আদেশে বিভিন্ন ধাপে ৩৩ লাখ টাকা দেয় বাস কর্তৃপক্ষ। ছয় বছর আগে রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকায় দুই বাসের চাপায় প্রাণ হারানো তিতুমীর কলেজছাত্র রাজীবের দুই ভাইকে হাইকোর্ট ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ দিলেও মাত্র ৫ লাখ টাকা দিয়েছে বাস কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি আপিল বিভাগে এখনো বিচারাধীন। ঋণ জালিয়াতি নিয়ে টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক জাহালমের বিনা দোষে কারাবাসের ঘটনায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ব্র্যাক ব্যাংককে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিলেও এখন পর্যন্ত জাহালম পেয়েছেন মাত্র ৫ লাখ।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা ভুক্তভোগী তাদের প্রায় সবাই স্বল্প আয়ের মানুষ। নির্দিষ্ট আইন নেই। হাজার হাজার টাকা কোর্ট ফি দিয়ে মামলা করে বছরের পর বছর মামলা চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, ‘যাদের অবহেলায় মানুষ ভুক্তভোগী হন তাদের সবাই প্রভাবশালী। দুর্ভাগ্য হলো, তাদের পক্ষে বড় বড় আইনজীবী মামলা করেন। ভুক্তভোগীদের পক্ষে কেউ থাকেন না। অনেকে এগিয়ে এলেও নানা কারণে একপর্যায়ে থেমে যান। মামলাও তার গতিতে থাকে না।’
টর্ট আইনের ধারণায় দেওয়ানি আদালতে মামলা
ক্ষতিপূরণ নিয়ে ‘টর্ট আইন’ নামে ব্রিটিশদের তৈরি একটি আইনের কথা আইনজীবী ও বিচারসংশ্লিষ্টদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। লাতিন এই শব্দের বাংলা অর্থ করে আইনজীবীরা বলেন, এটি ব্যক্তির দায়, দেওয়ানি ক্ষতি, ব্যক্তিগত অপকারজনিত ও অবেহলাজনিত প্রতিকারের আইন। কিন্তু বাংলাদেশে এ আইনটি প্রচলিত ও বিধিবদ্ধ নয়। ফলে এর কার্যকারিতাও প্রায় নেই বললেই চলে। এ আইনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণের জন্য অধস্তন দেওয়ানি আদালতে মামলা হয়। অপঘাতে মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় এবং অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তি কী পরিমাণ অর্থ রোজগার করতেন তা অনুমান করে মামলায় ক্ষতিপূরণ উল্লেখ করা হয়। মামলার সঙ্গে দিতে হয় সর্বোচ্চ ৬০-৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কোর্ট ফি। এর সঙ্গে আইনজীবীর ফি ও আদালতে যাওয়া-আসাসহ অন্য খরচ তো আছেই। ফলে অসচ্ছল মানুষের পক্ষে মামলা করা সম্ভবপর তো হয়ই না, মামলা করলেও তা চলে বছরের পর বছর। বিকল্প হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বা তাদের পক্ষে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট মামলা হয়। কিন্তু বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় তাও আলোর মুখ দেখে না।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনাসহ সংশ্লিষ্ট কিছু আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান আছে। কিন্তু সেখানে গবেষণা করে কত ক্ষতি হয়েছে সেটা নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে হাইকোর্টে যাওয়ার পর ধারণাপ্রসূত নির্ধারণ হয়। সংগতকারণেই প্রশ্ন আসে যে, নির্ধারণটা আসলে কত হবে। কেননা একেকজনের ক্ষতি তো একেকরকম। এসব নানা জটিলতায় বেশিরভাগ মামলায় প্রতিকার আসে না। সরকারের উচিত প্রয়োজনে আইন ও নীতিমালা করে সুনির্দিষ্ট বিধানগুলো আরও স্পষ্ট করা।’
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন মনে করেন, টর্ট আইনের প্রচলন থাকলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আরও সহজ হতো। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট যদি আদেশ দেন এবং আপিল বিভাগে যদি বাতিল না হয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে এটা দিতেই হবে। যদি সময় নষ্ট করে তাহলে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা যায়।’ তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পক্ষে ও জনস্বার্থে আইনজীবীরা মামলা করেন। রুল, আদেশ বা আপিলের পর অনেকের আগ্রহ কমে যায়। আইনজীবীরা যদি তৎপর হন তাহলে আদালত দ্রুত নিষ্পত্তি করবে।’
