একের পর এক অগ্নিদুর্ঘটনা ব্যাপক প্রাণ ও সম্পদহানির কারণ হলেও আমাদের বোধোদয় হচ্ছে না। রাজধানীর নিমতলী থেকে শুরু করে সবশেষ বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আবারও দেখিয়েছে, কতটা অব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার মধ্যে আমাদের বসবাস। আগুনের বীভৎস তাপে মানুষ পুড়ে ছাই হয়। কোটি কোটি টাকার সম্পদ মুহূর্তে নাই হয়ে যায়। সর্বহারা হয়ে উদাস চোখে তাকায়, শত শত পরিবার। দেশব্যাপী হাজার জীবন হারানোর পরও, আমাদের বোধোদয় হয় না। তবু এক নিদারুণ ঘোরের মধ্যে পথ চলছি। এমন সর্বনাশা অগ্নিকা- থেকে কীভাবে, কোন কর্তৃপক্ষ আমাদের রক্ষা করবেন- তা জানা নেই। শুধু এটুকু জানি, আমাদের ব্যবসা করতে হবে। আয় করতে হবে। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে, অর্থবিত্তে।
আগুনের ঝুঁকিতে থাকা মার্কেটগুলোর যে তালিকা রয়েছে, সেখানে বেশ কিছু ব্যস্ত ও জনপ্রিয় মার্কেটও রয়েছে। যেমন গাউছিয়া, চাঁদনীচক, নীলক্ষেতের বইয়ের দোকান, টিকাটুলির জুতার মার্কেট, মৌচাক মার্কেট, বঙ্গবাজার মাজার রোডের কাপড়ের মার্কেট ও রাজধানী সুপার মার্কেট, শাঁখারীবাজারের দুই সড়কের পাশের মার্কেট। আগুনের ঝুঁকির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মার্কেটগুলোতে আগুন নির্বাপণের ব্যবস্থা নেই, আলো-বাতাসের স্বল্পতা, বিদ্যুতের তারের ছড়াছড়ি ও সরু গলি। সেই মার্কেটগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের পর্যাপ্ত সড়ক নেই। হঠাৎ আগুন লাগলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক মানুষ বের হওয়ার কোনো পথ নেই। এ ছাড়াও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালে ঢাকার বহুতল ভবন, শিল্প-কলকারখানা, অন্যান্যসহ ১ হাজার ১৬২টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ৪৯৯টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ১৩৬টি ভবনকে নোটিস দেয়। আগুন লাগলে আশপাশে কোনো জলাশয় নেই, যেখান থেকে পানি এনে আগুন নেভানো যাবে। এ ছাড়াও অনেক মার্কেট রাজউকের নকশা অনুযায়ী করা হয়নি। প্র্রশ্ন হলো, ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলো এরপরও কীভাবে চলছে? দিনের পর দিন রাজউকসহ কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই এসব ভবনে অবৈধভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রেস্তোরাঁগুলোয় যত্রতত্র রাখা থাকে যাচাই-বাছাইহীন গ্যাস সিলিন্ডার। আবাসিক ভবনে অবৈধভাবে কেমিক্যাল মজুদ করে রাখাও বন্ধ হয়নি। নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতায় রাজধানী এখন রীতিমতো অগ্নিকুণ্ডের ওপর বসে আছে।
ঠিক এইরকম অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লী। সেখানে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার শোরুম ও ৫ হাজার কারখানা। যেখানে বিভিন্ন কাজে জড়িত কয়েক লাখ শ্রমিক। এ ছাড়া হাজারো ক্রেতার ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু ভয়ংকর অগ্নিঝুঁকির মধ্যে চলছে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ পোশাকপল্লীর কার্যক্রম- জানা গেল দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে। ‘অগ্নিঝুঁকিতে পোশাকপল্লী’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে- পল্লীর প্রতিটি ভবন একটি আরেকটির গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। এ ছাড়া ভবন ঘেঁষে বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বৈদ্যুতিক তারের জটলা, যা থেকে শর্টসার্কিট হয়ে যেকোনো সময় আগুন লাগতে পারে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যবসায়ীদের অনীহা আর মালিক সমিতির দায়িত্বে গাফিলতিতে ঝুঁকি বেড়ে গেছে বহুগুণে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও পোশাকপল্লী পরিদর্শন করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ত্রুটি দেখতে পেয়েছেন। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যা রয়েছে, তা অপ্রতুল। এলাকাবাসী বলছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পল্লী জুড়ে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বঙ্গবাজার ও বেইলি রোডের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।
এরকম অবস্থায় সরকারের কোন কোন কর্তৃপক্ষের দ্রুত এগিয়ে আসা দরকার? আগুন লাগার পর হা-হুতাশ না করে, আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করা দরকার। ক্ষতি যতটা না বেশি সরকারের, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবসায়ীদের। বিষয়টি তাদেরই সবার আগে উপলব্ধি করে দ্রুত সমাধান করতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়- অপেক্ষা শুধু ধ্বংসযজ্ঞের জন্য। অর্থসম্পদ এবং জীবনসম্পদের প্রতি দায়বদ্ধতাই কেবল আকস্মিক অগ্নিকা-ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখালে, করুণ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর যেসব ব্যর্থতায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
