রাজধানীতে হোটেল রেস্তোরাঁর ব্যবসা বেশ জমজমাট। মডার্ন যুগে হোটেল রেস্তোরাঁর নামকরণও বাহারি। ওয়াসিস রেস্তোরাঁ, ভবনে বার্গার এক্সপ্রেস, সেশিয়েট, ক্যাফে জেলাটেরিয়া, কেএফসি, পিজ্জাহাট, দোসা এক্সপ্রেস, সেভেন পিক, থ্রিথ্রি ও সিক্রেট রেসিপি আরও কত বাহারি নাম। এছাড়া ফুডকোর্ট নামে নগরীর অভিজাত এলাকাগুলোতেও চলছে রেস্তোরাঁ ব্যবসা। বড় শপিং মলগুলোতে ফুডকোর্ট আছে। এসব রেস্তোরাঁ ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানেও পাওয়া যায় বার্গার, চিকেন কাবাব, ফ্রাইড চিকেন, নুডলস, চিকেন চাপসহ নানান খাদ্য। একটু ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে- কোনো রেস্তোরাঁ, ফুডকোর্ট কিংবা ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁই খালি থাকে না। মানুষ শুধু খাচ্ছে। এই খাবার দৃশ্য দেখলে মনেই হবে না এদেশের মানুষ মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট। তবে মূল্যস্ফীতি থাকলেও এদেশের মানুষের মধ্যে পেশার যে বৈচিত্র্য এসেছে তা অনস্বীকার্য। রেস্তোরাঁ ব্যবসা এক সময় কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ব্যবসা বলে ধরা হলেও, এখন অনেক শিক্ষিত তরুণ যুবক রেস্তোরাঁ ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। চাকরির পেছনে না দৌড়ে স্বাধীন পেশা ও ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছেন।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের একটি রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা আমাদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। অনেক আশা, স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস অকস্মাৎ বিবর্ণ হয়েছে। এ দুর্ঘটনা ত্রুটিপূর্ণ ভবন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গ্যাস সিলিন্ডারে দুর্ঘটনার বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এনেছে। কেউ বলছে ভ্রাম্যমাণ বোমায় ভাসছে ঢাকা। ওই ঘটনার পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অনুমোদনহীন ও নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। শুধু রাজউক না, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষও যে যার মতো অভিযান চালাচ্ছে। রাজধানীর বেইলি রোডের রেস্তোরাঁর দুর্ঘটনা এই উৎসাহ বাড়িয়েছে সব সংস্থার মধ্যে। মানুষের জীবন বাঁচাতে, অগ্নিঝুঁকি দূর করতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান চালাতেই হবে। কিন্তু সেটা নিয়মিত, গঠনতান্ত্রিক উপায়ে হওয়াই তো বাঞ্ছনীয়। সমন্বয়হীন কোনো কর্ম ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মূলত একটি রেস্তোরাঁ স্থাপনে ১০টি সংস্থার প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনাপত্তিপত্র, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেস্তোরাঁ লাইসেন্স, সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের লাইসেন্স নিবন্ধন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দোকান লাইসেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ই-ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ফায়ার লাইসেন্স, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থানগত ছাড়পত্র। এখন জানা প্রযোজন, রাজধানী বা সারা দেশে যেসব রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে সেগুলোর কয়টি এসব নীতিমালা পালন করেছে এবং কয়টি করেনি? এসব প্রত্যয়নপত্র ছাড়া তারা কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে? এগুলো কেন এতদিন চিহ্নিত হলো না? কোন কোন সংস্থার এসব দেখভালের দায়িত্ব ছিল এবং তারা দায়িত্ব পালনে কতটুকু অবহেলা করেছে। আর তাদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য কী শাস্তির বিধান রয়েছে। রাজউকের তথ্য বলছে, রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের আওতাধীন এলাকায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৬টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯ হাজার ভবনের অনুমোদন আছে। আর ২০ লাখ ৪৬ হাজার ১৮৩টি ভবনের অনুমোদন নেই। হিসাব বলছে, ৯৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভবনই অনুমোদনহীন। এছাড়া অনেক আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ঢাকার এক হাজার ১৬২টি ভবন পরিদর্শন করে। এরমধ্যে ৬৩৫টি ভবনকে আগুনের ঝুঁকিতে থাকা চিহ্নিত করে নোটিস দেয়। এরমধ্যে ১৩৬টি আবার অতি ঝুঁকিপূর্ণ। মোট ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ৬৩৪টি। শতকরা হিসাবে ৫৪.৬৭ ভাগ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছরই তারা ভবন পরিদর্শন করেন। ঢাকার ভবনগুলোর ৫৫ ভাগেরও বেশি আগুনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর তার মধ্যে সরকারি ভবনও আছে। ২০২৩ সালেও দুই হাজারের মতো ভবন ঢাকায় পরিদর্শন করেছে ফায়ার সার্ভিস। সেখানেও অর্ধেকের বেশি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস। পরিদর্শনের সময় ভবনের মাটির নিচের জলাধারের ধারণ ক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকরণ যন্ত্রের উপস্থিতি, মেঝের আয়তন, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, লিফট, ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা ইত্যাদি খতিয়ে দেখে ভবনগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট ২৭ হাজার ৬২৪টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন ৭৭টি। এসব আগুনের ঘটনায় সারা দেশে মোট ২৮১ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৭৯২ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস তার প্রতিবেদনগুলোতে ওই সব অনিয়ম এবং ঝুঁকির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নিয়েছে তার উল্লেখ করেনি। বাস্তবে তারা কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয় না। যেমন বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজের’ ব্যাপারে তারা তিন বার নোটিস দিলেও আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলছেন ‘আমরা নোটিসের পর মামলা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারি। তবে মামলা করে তেমন ফল হয় না। ২০১৪ সালের ফায়ার বিধিমালা স্থগিত থাকার ফলে মামলা কাজে আসে না। আর নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় মোবাইল কোর্ট পারিচালনাও কঠিন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিলগালা করতে পারি না। আইনে আমাদের সেই ক্ষমতা নেই। বারবার নোটিস দেওয়ার পরও যখন ভবন মালিক আমলে না নেয় তখন আমরা ভবনটি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিস টানিয়ে দিই। কিন্তু আমরা চলে আসার পর তা তারা ছিঁড়ে ফেলেন। কেউ কেউ ভবনের নিরাপত্তা বাড়ান। তবে অধিকাংশই এটা আমলে নেন না। কারণ তারা জানেন এরপর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
দুর্ঘটনার পর মূলত রেস্তোরাঁ বন্ধের অভিযান চলছে। অভিজাত এলাকার নামিদামি রেস্তোরাঁতে অভিযান চালিয়ে বন্ধ, সিলগালা, জরিমানা করা হচ্ছে। কোথাও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়া রেস্তোরাঁ। অথচ এসব রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছিল কর্র্তৃপক্ষের সামনেই। হয়তো কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে। এসব অভিযানে বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়মের খবর। অভিযানে কোনো না কোনো ত্রুটি তারা পাচ্ছে। অভিযানের পর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে এখানে রেস্তোরাঁ করার অনুমোদন ছিল না। তাহলে কি প্রশ্নটা আসে না যে, যখন ভবনগুলো বছর ধরে নির্মাণকাজ করেছে তখন রাজউক কী করেছে? রাজউকের ওই কর্মকর্তা এখন কোথায় যার উপস্থিতিতে অনিয়মগুলো হয়েছে। এই দুর্ঘটনাটি না ঘটলে এসব অনিয়মের খবর কি আমরা পেতাম? বেইলি রোডের ঘটনার পর রাজউকের নগর উন্নয়ন কমিটির বৈঠকে কর্মকর্তারা জানান, রাজউকের আওতাধীন এলাকার আবাসিক কাম অফিস হিসেবে নির্মিত কোনো ভবনে দোকানপাট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার সুযোগ দিতে চান না তারা। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে, রাজউকের আওতাধীন এলাকায় অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো ভবনে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সামনে বড় আকারে নোটিস টানানো থাকবে। গুগল ম্যাপে ট্যাগ করে দেওয়া হবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নোটিস। ভবন ও কমার্শিয়াল ভবনের ক্ষেত্রে বীমা করতে হবে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে যথাযথ ডকুমেন্ট নিশ্চিত করা হবে। অনুমোদনহীন ভবনের অবস্থা যাচাইয়ে থার্ড পার্টি নিয়োগের বিষয়ে যে নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে তা চূড়ান্তকরণে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত প্রদান করা হবে। এসব সিদ্ধান্তের কিছু কিছু বিষয় ইতিমধ্যে চালু আছে। যা অবজ্ঞা করে বা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে যারা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তাদের এখন কেন জরিমানা করা হবে?
ড্যাপের সমীক্ষা রিপোর্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকার ভবনগুলোর মধ্যে ৮৮ ভাগ ভবন অবৈধ। আর বাকি ১২ ভাগ কোনো না কোনোভাবে ব্যত্যয় করেছে। রাজউক এলাকায় মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট আছে। তাহলে বাকিরা কীভাবে গড়ে উঠল? এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের বিষয়ে একটি সূত্র মতে, দেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ লাখ পরিবার এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে। আবাসিক ও বাণিজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ থাকায় এখন রান্না চলে গ্যাস সিলিন্ডারে। এসব সিলিন্ডার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজধানীতে রেস্তোরাঁগুলোতে অধিকাংশতেই এলপিজি গ্যাসনির্ভর। মজুদ করতে হচ্ছে
রেস্তোরাঁর স্বার্থে। কিন্তু যেভাবে তারা সিঁড়ির নিচে বা এমন স্থানে সংরক্ষণ করছে সেটা যেমনি ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি রান্নাঘরে যেসব সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে সেগুলোতে লিক আছে কি না তা প্রতিনিয়তই লক্ষ্য রাখা হয় না। হয়তো এই কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছে। সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে বাসাবাড়িতেও। ফলে অগ্নিঝুঁকি তো বাসাবাড়িতেও আছে। তাহলে আমরা কি পরবর্তী সময়ে দেখব বাসাবাড়িতেও সিলিন্ডার ব্যবহারের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে সংস্থাগুলো? নগরীতে মুক্ত পরিবেশ নেই বললেই চলে। পার্কগুলো দখল হয়ে আছে। যেটুকু আছে সেখানে ভিক্ষুক, হকারদের কারণে বসে থাকা দায়। তারপর রয়েছে নিরাপত্তার বিষয়গুলো। এসব কারণেই পরিবার-পরিজন বা প্রিয় কোনো মানুষের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে যেতে হয় রেস্তোরাঁয়। সেখানে খাওয়াটা অনেকের কাছেই মুখ্য না। একটু গল্প একটু ভালো সময় কাটানো। কিংবা জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর সেলিব্রেশন কিংবা বহুদিন পর বন্ধুদের রি-ইউনিয়ন এ-সবই তো হয় রেস্তোরাঁগুলোতে। আধুনিক যানজটে ঠাসা নগরীতে এতটুকু স্বস্তির জায়গা তো পেতেই পারে নগরবাসী। একটি দুর্ঘটনা থেকে অন্তত এই শিক্ষা আমরা নিতে পারি মানুষের স্বস্তির জায়গাটুকু নিরাপদ করা যায় কীভাবে? সিলগালা, বন্ধ বা জরিমানা কিংবা গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা না করে উদীয়মান রেস্তোরাঁ ব্যবসাকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে চলতে সরকারের সব সংস্থাকে এগিয়ে আসা উচিত। পাশাপাশি যারা এ ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছেন তাদেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কেননা এ ধরনের দুর্ঘটনায় কাস্টমার হিসেবে আক্রান্ত হতে পারেন তাদেরও প্রিয়জন।
লেখক: সাংবাদিক
