বর্তমানে প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক দূষণ। ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাস্টিকের মধ্যে রয়েছে পলিথিন ব্যাগ, বিভিন্ন পণ্য সামগ্রিক মোড়ক ও পেট বোতল। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক যোগে প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা হয়। তবে এই ধরণের পলিথিনের বিপদটা আরও বিস্তৃত এবং দিনে দিনে বাড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাবের মতো। অবস্থাটা এখন এমনই যে, বছরের পর বছর জমতে জমতে বাংলাদেশের ভূভাগের একটি বড় অংশ মাটির পরিবর্তে পলিথিন দ্বারা আচ্ছাদিত। শহর অঞ্চলে তো বটেই, গ্রামেও দিনে দিনে এর প্রকোপ বাড়ছে।
গত কয়েক দশকে দেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি পলিথিন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে মূলত উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাপটে। সে ক্ষেত্রে ভোক্তারাও কম যান না। আমাদের প্রত্যেকটা বাজার একেকটা যেন আস্ত পলিথিনের গোডাউন। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই যেন পলিথিনেই ভরসা খুঁজে পায়। প্রতিদিনের চাল, ডাল, আলু ও অন্যান্য বাজারের সঙ্গে থরে থরে পলিথিন আসতে থাকে ঘরে, তার কোনো কোনোটা এক-দুবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয় অন্যসব গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গে। ফলাফল শয়ে শয়ে টন পলিথিন বর্জ্য তৈরি করছে। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন আড়াই কোটি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন ত্রিশ হাজার টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। যার মধ্যে সাত হাজার টন উৎপাদন হয় ঢাকা শহরে এবং এর মধ্যে দশ শতাংশই হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। এর একটা অংশ রিসাইকেল করা হলেও, তা সামান্য, তার মানে এক ঢাকাতেই প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন বা তারও বেশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ঢাকার ড্রেন, জলাভূমি, খাল, নদী ও পরিত্যক্ত স্থানে জমতে থাকে। আবার এসব বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনার অভাবে নির্বিচারে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শহর অঞ্চলের খালগুলো তো অবশ্যই, পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে নদীগুলোও নর্দমা হওয়ার দশা। এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৬৫টি খালের মধ্যে ২২টি খাল ভরে গেছে মূলত পলিথিনের কারণে। আর বাড়তি পাওনা ব্যাপকভাবে মশা ও রোগ জীবাণুর বিস্তার ঘটিয়ে চলছে অনবরত। পলিথিন যে কীভাবে খাল ও নদী গিলে ফেলেছে তার প্রমাণ মোহাম্মদপুরের সোসাইটি খাল, মিরপুরের প্যারিস ও হবিগজ্ঞের খোয়াই নদী, ঢাকার আশপাশের নদী তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা আরও কত কত। অবশ্যই সবক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সমস্যা। কিন্তু পলিথিনির পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা সম্ভব না, এর একমাত্র সমাধান উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।
পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন সরকারের নতুন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু আশাবাদ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী নিজে একশ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, যার প্রধান বিষয়ই হচ্ছে দূষণ রোধ করা। এই পরিকল্পনায় পলিথিন ও প্লাস্টিক নিয়েও কর্মসূচিতে উদ্যোগ আছে, তবে সমস্যার ব্যাপকতা ও প্রয়োজনীয় মাত্রায় নয়। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, এই কর্মসূচির ধারাবাহিকতা এবং কীভাবে তা সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি বিবেচনা করলে পলিথিনের বিপর্যয় এখন এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখান সমাধানের পথ খোঁজা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। পলিথিন বন্ধের সরকারি প্রতিশ্রুতি আগেও ছিল। ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এটা ছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাবেক পরিবেশমন্ত্রীর ঘোষণা। সেই সময় তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ৮০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছিলেন। এখানে বলে রাখা ভালো, প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার ও রিসাইকেল দুটোই পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারলে সরকারের এই লক্ষ্য পূরণ করা অসম্ভব হবে না। কিন্তু আসল সংকটটা এখানেই। কারণ ২০২৩ সালের পর এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এ সংক্রান্ত কোনো দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। তবে এবার নতুন সরকারের একশ দিনের কর্মসূচিতে বেশ কিছু নতুন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সচিবালয়কে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক মুক্ত ঘোষণা করা, অন্যান্য সরকারি অফিসগুলোতে একই ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান, পরিবেশদূষণ রোধে প্রতি বিভাগে দুটি করে একবার ব্যবহারযোগ্য মুক্ত স্কুল ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন ও উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে প্রতি বিভাগে দুটি করে ‘জিরো ওয়েস্ট ভিলেজ’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া ইত্যাদি। লক্ষ্য হিসেবে সামান্য কিন্তু ভালো উদ্যোগ বলা যায় নিঃসন্দেহে।
পরিবেশদূষণের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যাওয়া ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া একই সুতায় গাঁথা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের জীবন চক্রের প্রত্যেকটি পর্যায়ে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে থাকে, এর শুরু থেকে রিসাইকেল করা পর্যন্ত। পৃথিবীর ৩ শতাংশ গ্রিন হাউজ গ্যাসের জন্য দায়ী প্লাস্টিক পণ্য এবং তা ধীরে ধীরে আরও বাড়ছে। সরকারের একশ দিনের কর্মসূচিতে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন মোকাবিলায় কতটা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আলোকে দেখা হয়েছে, পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের তালিকা প্রণয়ন ও প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে, এর উৎপাদন ও ব্যবহার হ্রাসের কর্মপরিকল্পনাও করার কথা বলা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় যে, এর বাস্তবায়ন কতটা হয়।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শুধু সচেতনতা সৃষ্টি ও জনগণের অভ্যাসগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য এখন প্রয়োজন পলিথিনবিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং এর মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা। পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই প্রয়োজন, তবে তা করতে হবে উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে। অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিমধ্যে প্রকৃতিতে চলে যাওয়া পলিথিন সংগ্রহ করে যতটুকু সম্ভব ততটুকু পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনায় আওতায় নিয়ে আসতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আর সেটাই হবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার স্মার্ট উদ্যোগ। ইতিমধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুব স্বেচ্ছাসেবকরা দেখিয়েছে যে, ইচ্ছা থাকলে এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকলে খাল বা প্রাকৃতিক জলাধারগুলোতে প্ল্যাস্টিক মুক্ত করা কঠিন কিছু নয়। এগুলোকে নর্দমা থেকে আবার প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে তৈরি করা সম্ভব। এখন সরকারি পর্যায় থেকে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা দরকার।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
