সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯-এ, দেশের জনগণের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে তাদের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিকের অধিকার ও প্রাপ্য সেবা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা নিশ্চিত করে। এক্ষেত্রে নাগরিক সরকারি, সুশীল সমাজ সংস্থা কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্যের আবেদন করতে পারে। এই নীতিটি সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানেরই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখার কথা। বলা হচ্ছে, এই আইনের মাধ্যমে জনগণ সরকারের সব কর্মকান্ড সম্পর্কে জানতে পারবে। যার মাধ্যমে সরকারের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
আসলে কোন পক্ষ সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বা শত্রু ভাবে? এরা কি তারাই, যারা নিজেদের অন্যায় আড়াল করতে চায়? আসলে যারা অপরাধী, তারাই সাংবাদিককে ভয় পায় বা প্রতিপক্ষ ভাবে। কারণ একজন মানুষ যখন অন্যায় করে, সেই অন্যায়টি যখন অন্য পেশার মানুষ দেখে ফেলে বা জেনে গেলে যতটুকু না ঝুঁকি তৈরি হয়, একজন সাংবাদিক তা জেনে গেলে সেই ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। ক্ষমতাবানরা জানে, তাদের অন্যায় কাজ দেশের মানুষ শুধু এই সাংবাদিকদের মাধ্যমেই জানতে পারে। যেহেতু অপরাধী-দুর্নীতিবাজরা অবাধ লুটপাট করতে পারে না শুধু গণমাধ্যমের ভয়ে, তাই গণমাধ্যমই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ এবং শত্রু। গণমাধ্যমকে কোনোভাবেই শায়েস্তা করা না গেলেও রাষ্ট্রের পক্ষে কেউ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে রাখতে চায়, যাতে গণমাধ্যম নিজেই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে পড়ে এবং সেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে অন্যদিকে নজর দেওয়ার সুযোগ না পায়। সম্প্রতি দৈনিক দেশ রূপান্তরের শেরপুর নকলা উপজেলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানা তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়ার সাজানো অভিযোগে ইউএনওর কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে কারাদ- দেওয়ার ঘটনাটিকে এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনাই বলব। এ বিষয়ে রবিবার ‘তথ্য চাওয়াকে অপরাধ গণ্য করা আরও বড় অপরাধ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
রানার ছেলে শাহরিয়ার জামান মাহিন জানায়, বাবাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার পর ইউএনও এসিল্যান্ডকে বলেন, রানার মোবাইলে ভিডিও ধারণ করা আছে। ওর মোবাইল দুটো নিয়ে নাও। পরে ইউএনও স্যারের সিকিউরিটি জোরপূর্বক বাবার মোবাইল কেড়ে নেয় এবং মোবাইলের লক খোলার জন্য বাবার কাছে কোড নম্বর চায়। কিন্তু বাবা কোড নম্বর না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দেওয়া হয়। বর্তমানে শফিউজ্জামান রানার মোবাইলটি তাদের কাছে রয়েছে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, ‘তথ্য অধিকার হলো একটি আইন। এই আইনের অধীনে যেসব ক্ষেত্র আছে, সেই ক্ষেত্রগুলোতে নির্দিষ্টভাবে আছে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার। কর্র্তৃপক্ষের কাছে যে তথ্য আছে সেই তথ্য দিতে তারা বাধ্য। আর সাংবাদিক তথ্য চেয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি যদি ইউএনও করে থাকে তাহলে এটি অপরাধ করেছে। আশা করি কর্র্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেবে।’ তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, ‘সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকরা অবাধ তথ্য সংগ্রহের জন্য যেকোনো স্থান যাবে। এটা তাদের অধিকার। সেই তথ্য নিতে গিয়ে যদি সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়, সেটা তাদের অধিকারকে খর্ব করার শামিল।’
আমরা আশা করব, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরকম ঘটনার ফলে সরকারের ন্যায়বিচারের প্রতি প্রকৃত আন্তরিকতা এবং আইন সবার জন্য সমান কথাটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, অনতিবিলম্বে শফিউজ্জামান রানার জামিনের ব্যবস্থা হবে এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে। একজন সাংবাদিকের প্রতি সবার আন্তরিকতা এবং সহমর্মিতাই কেবল সত্য তথ্য উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে, অন্য কোনোভাবে নয়।
