বেদখল ডাকসুর দখলে ছাত্রলীগ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৪, ০২:২৮ এএম

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। এ সংশ্লিষ্টতার কারণে গড়ে উঠেছে ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। দীর্ঘদিন অচল থাকার পর ২০১৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সচল হয় ডাকসু ও ১৮টি হল সংসদ।

সে নির্বাচনের পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও নেই নতুন নির্বাচনের লক্ষণ। সংসদ কার্যকর না থাকায় ডাকসুর কেন্দ্রীয় ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল সংসদের কক্ষও যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ডাকসু ভবনের বেশিরভাগ কক্ষ ও বেশিরভাগ হল সংসদ ব্যবহার করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

ডাকসু ভবনের দ্বিতীয়তলায় আটটি কক্ষ রয়েছে। দুটি কক্ষ ডাকসু নির্বাচন বন্ধ হওয়ার পর থেকে তালাবদ্ধ। একটিতে বসতেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ও আরেকটিতে সাধারণ সম্পাদক (জিএস)। ডাকসুর সাবেক এজিএস বর্তমান ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন, সাবেক সাহিত্য সম্পাদক ও বর্তমান ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন এবং সাবেক ডাকসু সদস্য ও ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত নেতাকর্মীদের নিয়ে তাদের পুরনো কক্ষে বসেন এবং ডাকসু ভবনে আড্ডা দেন বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও সেখানে আড্ডা দেন ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালান বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল সংসদের কক্ষগুলোও বেদখল। হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত নেতাদের অনেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় মেয়াদ শেষেও তারা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন এসব কক্ষ। হল সংসদে না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে হল ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে এসব ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে বিরোধী কোনো ছাত্রসংগঠন এ সুযোগ পায় না।

কেন্দ্রীয় ডাকসু ভবনের এক কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাদ্দাম ভাই, শয়ন ভাই এবং সৈকত ভাই মাঝেমধ্যে এখানে আড্ডা দেন; ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম থাকলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে এখানে বসেন। ডাকসু সচল না থাকায় অন্যরা সেভাবে আসেন না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের এক কর্মচারী বলেন, ‘হল ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকই রুমটি ব্যবহার করেন। উনারা চাইলে রুমের তালা খোলা হয়, না হলে বন্ধ থাকে।’

২০১৯ সালে ডাকসুর যে নির্বাচন হয়, তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার পর ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেল নির্বাচন বর্জন করেছিল। ডাকসুর ২৫ পদের ২৩টিতেই জিতেছিল ছাত্রলীগ। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে ডাকসুর ভিপি পদে বর্তমান গণ অধিকার পরিষদের একাংশের নেতা নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে আখতার হোসেন নির্বাচিত হন। সেই ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর বেশ সহাবস্থান তৈরি হয়েছিল, যা এখন শূন্যের কোঠায়। ফলে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের বলে মনে করেন ছাত্রনেতারা।

শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবিদাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে অনশন করেন সমাজকল্যাণ অনুষদের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্সের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ।

ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ প্রায় সব ছাত্রসংগঠন তৎপর ছিল। বিশেষভাবে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো বেশি সোচ্চার ছিল। আন্দোলন এবং উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ডাকসু নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এখন সেভাবে কাউকে এ দাবিতে আন্দোলন করতে দেখা যায় না। ক্যাম্পাসে সহাবস্থান না থাকাও একটা বড় কারণ বলে মনে করেন অনেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদল সবসময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে। ডাকসুতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পূর্ণ প্যানেলে নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করে দ্রুত ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে এবং প্রশাসনও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না।’

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি দীপক শীল বলেন, ‘সর্বশেষ ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হলেও সেটি ছিল ব্যালট ছিনতাই ও কারচুপির নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের অনুকরণে এখানেও ছাত্রলীগ প্রায় সব পদ বাগিয়ে নেয় এবং দুটি পদ ভিন্ন প্যানেলের দুজনের জন্য ছেড়ে দেয়। ডাকসু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বরং ডাকসুকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ মারাত্মকভাবে হোঁচট খেয়েছে। আমরা গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করে ডাকসু নির্বাচন চাই।’

ছাত্রলীগের শীর্ষ চার নেতার তিনজনই ডাকসুর সাবেক নেতা। তবু এ নির্বাচনের দাবিতে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি তাদের। তবে তাদের দাবি, ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে তারা। ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করা যায়। আমরা সবসময় ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে। আমরা ঢাবি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছি, আলোচনা করব এবং আলোচনা সফল না হলে আন্দোলনও করব।’

সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমরা সবসময় ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে আমরা বেশ কয়েকবার বলেছি। যদি আন্দোলন করার প্রয়োজন হয় তাহলে আন্দোলনও আমরা করব। তবে ডাকসুর ভবনগুলো ছাত্রলীগের দখলে নেই।’

ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর বলেন, ‘সরকারি দল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেউ চায় না ডাকসু নির্বাচন হোক। কেননা ডাকসু নির্বাচন হলে ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা তৈরি হয়। ক্যাম্পাসটাকে মিনি ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে রেখেছে ছাত্রলীগ। পুরো ক্যাম্পাস তাদের দখলে। ডাকসু না থাকার সুবিধা ভোগ করছে তারা।’

ডাকসুর সাবেক জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘ডাকসু থেকেই তিনজন ছাত্রলীগ নেতা এসেছে। তাদের উচিত সবার আগে দাবি জানানো। অন্যান্য ছাত্রসংগঠন এবং ছাত্রদেরও এ বিষয়ে তৎপর হওয়া উচিত। তবে ডাকসু সচল না থাকার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’

ডাকসু ভবনের কক্ষ বেদখলের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ ব্যবহার করছে কি না খতিয়ে দেখতে হবে।’

ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে। আমরা চাই নেতৃত্বের বিকাশ হোক।’

তিনি বলেন, ‘ডাকসু থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসুর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো সমস্যা সমাধানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সেজন্য ডাকসুর প্রয়োজন আছে। আমি সেদিকে মনোযোগ অবশ্যই দেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত