ইদানীং বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি চিকিৎসকদের নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সমালোচনা হচ্ছে যে এই ওএসডি চিকিৎসকরা চিকিৎসা কার্যক্রমের বাইরে থাকায় চিকিৎসক স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। স্বাস্থ্যের ওএসডির ব্যাপারে আমাদের ধারণাগত ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ একটা ধারণা রয়েছে যে, সরকারের ওএসডি কর্মকর্তারা বসে বসে বেতন নেন। কিছু ক্ষেত্রে এর সত্যতা হয়তো আছে কিন্তু বেশিরভাগ ওএসডি কর্মকর্তার বেলায় ঘটনাটি তেমন নয়। বিশেষ করে চিকিৎসকদের জন্য ঘটনাটি একদমই উল্টো। স্বাস্থ্য ক্যাডারে ওএসডি মানে উচ্চশিক্ষার জন্য ওএসডি। এক্ষেত্রে আরও লক্ষণীয় যে, চিকিৎসকরা এই উচ্চশিক্ষাও প্রায় শতভাগ দেশেই নেন এবং তাদের এই শিক্ষা কার্যক্রমের নব্বই ভাগই হচ্ছে হাসপাতালের রোগীদের সার্ভিস দেওয়া। তারা উচ্চশিক্ষার এই কোর্সে এসে হাসপাতালে রোগীই দেখছেন হাসপাতালের ইভনিং, নাইট সব ডিউটিই করছেন, উপরন্তু করোনা পরিস্থিতির মতো সময়ও তারা চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন যে কোনো সরকারি চিকিৎসা কর্মকর্তার মতোই। ফলে, তাকে যদি বলা হয় যে, সে তো ওএসডি ডাক্তার, চিকিৎসা কর্মক্ষেত্রে কর্মরতদের মধ্যে তিনি গোনায় আসবেন না সেটা ঠিক হবে না।
তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর রেসিডেন্টরা ওএসডি হিসেবে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল ইনস্টিটিউটগুলোতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে যোগ দেন। মূলত তারাই চালাচ্ছেন দেশের টারশিয়ারি হাসপাতালগুলো। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানে কতজন মেডিকেল অফিসার পোস্টেড আছেন তার হিসাব নেই বললেই চলে। ফলে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা চিকিৎসকরাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর চিকিৎসাসেবা ধরে রাখছেন। পোস্টেড মেডিকেল অফিসারদের হিসাব করে এসব প্রতিষ্ঠানের ওএসডি ডাক্তারদের গণনার বাইরে রাখা বা চিকিৎসা কর্মক্ষেত্রে তাদের গোনায় না ধরার প্রবণতা কিংবা চেষ্টা সঠিক নয়।
অনেকে বলেন, কিছু চিকিৎসক চাকরিতে যোগদানের অল্পদিনের মধ্যে উচ্চশিক্ষার কোর্সে চলে যান। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এটা প্রায় অসম্ভব। কেননা একটা নির্দিষ্ট সময়কাল গ্রাম বা প্রান্তিক পর্যায়ে চাকরি না করলে কাউকে উচ্চশিক্ষার ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। নিজের উদাহরণ দিয়ে বলি এমডি চেস্টের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময় থানা পর্যায়ে চাকরি সম্পন্ন করে আমি ওএসডি হিসেবে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় ট্রেনিংয়ের শর্ত পূরণের জন্য সরকারি টারশিয়ারি প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগদান করি। আজ যখন লেখাটি লিখছি, সেদিনের কথাই ধরা যাক, সকালে কয়েকজন রোগীর ব্রংকোসকপি করলাম, গতকাল বুকের সিটিস্ক্যানের ওপর ক্লাস নিলাম। এই বিশেষায়িত দক্ষতার সূচনা বিন্দু ছিল ওই দিনটা যেদিন সরকার আমাকে উচ্চশিক্ষার জন্য তার শহরের বড় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের অধীনে কাজ করতে যাওয়ার সুযোগ দেয়। হার্টের ধমনিতে রিং লাগাচ্ছেন যে কার্ডিওলজিস্ট, হার্টের ভাল্ব রিপ্লেস করছেন যে কার্ডিয়াক সার্জন, বার্ন ইনস্টিটিউটে প্লাস্টিক সার্জারির বিশেষায়িত সেবা দিচ্ছেন যে বিশেষজ্ঞ তাদের সবার গায়ে লেগে আছে ওএসডির গন্ধ।
হাসপাতালে গেলে দেখা যাবে অফিস টাইম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য চিকিৎসকরা চলে গেলেও রয়ে গেছেন এই মেডিকেলে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা ওএসডি রেসিডেন্ট/ট্রেইনিরা। আজ যেসব নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন তাদের সবাইকে রিসিভ করার পরেই তারপর তারা বাড়ি যাবেন। কেউ রয়ে যাবেন ইভনিং, নাইট ডিউটি করার জন্য। তাদের পড়াশোনা, জ্ঞানার্জন সব রোগীকেন্দ্রিক। রোগী, রোগীর এক্সরে, রোগের সিটিস্ক্যান এসবের ওপর ব্যুৎপত্তি অর্জনের পরেই তাদের পরীক্ষায় পাস মিলবে এটা তারা জানেন। তাই এই রোগীদের কেন্দ্র করেই তাদের ঘাম, শ্রম, সময়ের বিনিয়োগ। তাদের পড়াশুনা ও ট্রেনিংয়ের বাইপ্রডাক্ট হিসেবে রোগীরা তাদের ম্যানেজমেন্ট পেয়ে যাচ্ছেন। সিনিয়ররা থাকেন নির্দেশনার ভূমিকায়, রেসিডেন্টরা মাঠের সৈনিক। রোগী ম্যানেজমেন্টের অন্যতম ওয়ার্কফোর্স এই পোস্ট গ্রাজুয়েট রেসিডেন্ট/ট্রেইনি ওএসডি ডাক্তাররাই।
সরকারি যেসব ট্রেইনি কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পেয়ে অবশেষে ট্রেনিংয়ের জন্য ওএসডি হন তারা রোগীদের পেছনে দিনরাত যে শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করেন, সেটা বেতনের টাকা দিয়ে মাপা যায় না। আর সেটা করতে গেলেও একথা অস্ফুটে স্বীকার করতে বাধ্য হতে হবে যে, টাকাটা নেহাত কমই। ফলে, তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছে এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। বরং তারা চিকিৎসা কর্মকান্ডের মধ্য থেকেই তাদের কোর্সটি করছেন আর মাস শেষে তাদের বেতনের টাকাটাই পাচ্ছেন। উপরন্তু নিজেদের বিশেষায়িত করে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন এবং তারা দেশের মানুষেরই কাজে লাগছেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের আগের ও পরের চিকিৎসক এক নয়। এর উপকারিতাটা দেশের মানুষই পান অন্য কেউ নন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাস করুন বা ফেল করুন একটা নির্দিষ্ট সময়ের শেষে তারা আর ওএসডি থাকেন না। উদাহরণ স্বরূপ পাঁচজন ডেপুটেশন পেলে একই সময়ে পাঁচজনের ডেপুটেশন শেষ হয়ে যায়। ফলে ডেপুটেশন পাওয়া ওএসডি হওয়া মোট সংখ্যাটা একই থাকে। দুঃখজনকভাবে কতজন ডেপুটেশন পেয়ে ওএসডি হয়ে ট্রেনিংয়ে এলেন সেটা খুব হাইলাইটেড হয়, কিন্তু একই সংখ্যকের যে ডেপুটেশন শেষ হয়ে গেছে সেটা আর কারও নজরে আনা হয় না। আর কেউ যদি পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পরে একটা সময়ের বিরতিতে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিরতি অনেক লম্বা) শিক্ষক হয়ে যান সেটাও তো দেশেরই বিনিয়োগ। দেশে কি মেডিকেল শিক্ষকের অভাব নেই? শিক্ষক শূন্যতা তো আরও ভয়াবহ। মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও শিক্ষকের শূন্যতা পূরণে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনকে আরও উৎসাহ দেওয়া কি প্রয়োজন নয়? মুদ্রার এক পিঠ নিয়ে আলোচনা হয় অন্য পিঠ থেকে যায় অনালোচিত।
এখন আবার কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশীদের একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেলা সদরে ট্রেনিং করানো হোক। পুরো সময় মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউটে ট্রেনিং করেও মেডিকেলে উচ্চশিক্ষা করতে আসা ডাক্তাররা পাস না করে কোর্স আউট হয়ে যাচ্ছেন পাসের হার ১০, ফেলের হার ৯০ শতাংশ। জেলা সদরে তারা কী এবং কার কাছ থেকে শিখবেন? জেলা সদরে তো অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক তথা মেডিকেল শিক্ষক থাকেন না। হাতেকলমে কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা তদারকি কে করবেন? ট্রেনিংয়ের মান কারা নিয়ন্ত্রণ করবেন? এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ডিজাইনও একটি বড় বিষয়। জেলা সদরের হাসপাতালের কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও উদ্দেশ্যও এক নয়। ফলে এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটগুলোতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং হবে সেটাই ইপ্সিত। এর বাইরে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনিদের পাঠানো তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটগুলোতে টিচিং স্টাফ আছে এবং তাদের টিচিং অর্গানোগ্রাম সেভাবেই ডিজাইন করা। কিন্তু সদর হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম বা পরিবেশ শিক্ষা বা ট্রেনিং সহায়ক নয়। এমনকি বাংলাদেশের দূরবর্তী মেডিকেল কলেজগুলোও উচ্চশিক্ষার ট্রেনিংয়ের জন্য যথেষ্ট নয়।
আর কেবল হাতেকলমে রোগী দেখলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়া যায় না। অনেক চিকিৎসকও রোগী দেখে রেকর্ড গড়ে তুলতে পারেন। তারা একজন অধ্যাপকের চেয়ে ঢের বেশি রোগী দেখেন। সুপারভিশন না থাকলে এবং ভুলটা কোথায় হয় তা ধরিয়ে দেওয়ার কেউ না থাকলে পঞ্চাশ বছর ধরে রোগী দেখেও কেউ বিশেষজ্ঞ হবেন না। এসব আত্মঘাতী আলাপ আর সিদ্ধান্ত যারা দেন তারা মূলত গোষ্ঠীপ্রেমে বিভ্রান্ত। চিকিৎকরা নিজেরাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে নিজেদের উচ্চশিক্ষা কাঠামো ধ্বংসের গুটি চালাচ্ছেন এবং নীতিনির্ধারক মহলকে ভুল বুঝাচ্ছেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ প্রস্তাব আর হয় না।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট রেসিডেন্টদের ওপর সুবিচার করা না হোক অন্তত অবিচার যাতে না হয় কর্তৃপক্ষকে সেটা ভাবতে হবে। কেননা বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের দেশীয় এজেন্টরা কখনো চাইবেন না যে, এদেশে মেডিকেলের বিশেষায়িত শিক্ষা বিকাশ লাভ করুক। সব ধরনের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও উৎসাহ দেওয়া হোক। তাদের ওপর রাষ্ট্রের খরচকে অপচয় হিসেবে না ভেবে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
লেখক: এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (চেস্ট), সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
[email protected]
