মানুষের শরীরে প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় জানা গেছে ক্ষতিকর প্রভাবও। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সব জায়গায় পিঁপড়া রয়েছে। এখন বলতে হয় পৃথিবীর সব জায়গায় রয়েছে প্লাস্টিক। খাবারে, প্যাকেটে, টায়ারে, কাপড়ে, কলমে, কম্পিটারে, সাবমেরিন থেকে শুরু করে নভোযান; কোথায় নেই প্লাস্টিক। আর প্লাস্টিক ভাঙতে ভাঙতে এমন আণুবীক্ষণিক কণায় পরিণত হয় যে, নিয়মিত মানুষ অক্সিজেনের সঙ্গে তা গ্রহণ করছে। আর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। গবেষণায় যার প্রমাণও মিলেছে। ৬ মার্চ দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। তারা বলছে, ২০০ জনেরও বেশি লোকের সার্জারিতে জানা গেছে, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশের প্রধান ধমনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক এমনকি ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যাদের ধমনিতে প্লাস্টিক কণা ছিল তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্য রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা ৪.৫ গুণ বেশি।
মিশিগানের ডেট্রয়েটের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির চিকিৎসক রবার্ট ব্রুক। তিনি কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশগত প্রভাব অধ্যয়ন করেন। তার মতে, মানুষের শরীরে ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্রতর প্লাস্টিকের প্রভাব বুঝতে বিশ^জুড়ে এ ধরনের আরও গবেষণা জরুরি। তবে গবেষকরা বলছেন, এ ক্ষুদ্রকণায় স্বাস্থ্যের ক্ষতি নিয়ে অনুসন্ধান হলেও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়নি।
প্লাস্টিকের গ্রহ
বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পেয়েছেন। হোক সেটা মহাসাগরের গভীরে পড়ে থাকা ঝিনুকে, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মায়ের বুকের দুধে, পানিতে, বাতাসে, বৃষ্টিতে। এসব কণা দীর্ঘস্থায়ীও হয়। এগুলো নিশ্চিহ্ন হতে শতাব্দীকাল প্রয়োজন। চলতি মাসের প্রথম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গবেষকরা ২২ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মধ্যে ১৭ জনের রক্তের নমুনায় প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। এদের অর্ধেকের রক্তে আবার পিইটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। এ ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত পানির বোতলে ব্যবহার করা হয়। কিছু রক্তে পাওয়া গেছে পলিস্টাইরিন, যা খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের মোড়কে ব্যবহার হয়। এক-চতুর্থাংশের রক্তে পাওয়া গেছে প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহৃত পলিথিলিন। গবেষকরা বলছেন, এটি যুগান্তকারী গবেষণা ফল। তবে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। এর আগে কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মলে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ১০ গুণ বেশি। শিশুদের প্লাস্টিক বোতলে খাবার দেওয়ার কারণে এটা হয় বলে অনুমান গবেষকদের।
এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশি গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা রয়েছে। বিবিসি বাংলার তখনকার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশি মাছের ওপর এ গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ। বাজারে পাওয়া যায় এমন দেশি মাছের ওপর গবেষণা করে জানা যায়, ১৫ প্রজাতির মাছে প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি রয়েছে। তারা মোট ১৮ প্রজাতির ৪৮টি মাছ নিয়ে পরীক্ষা করেন। যার মধ্যে ৭৩ শতাংশ মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। যেসব মাছের পেটে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে রুই, তেলাপিয়া, কই, কালিবাউশ, বেলে, টেংরা, কমন কার্প, পাবদা, পুঁটি, শিং, টাটকিনি, বাইম, বাটা, মেনি ও বাছা। তার মধ্যে টেংরা, টাটকিনি ও মেনি মাছে বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
মানুষের রক্তে
গবেষকরা বলছেন, মানুষের শরীরে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের পর সেগুলো বের হতে পারে না। কারণ বর্জ্য অপসারণের কাজ করে যেসব কোষ, তারা এসব প্লাস্টিক কণা ভেঙে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে না। ফলে তা শরীরে জমা হতে থাকে। মানুষের রক্ত এবং ফুসফুস এবং ডিম্বাশয়ের মতো অঙ্গগুলোতে পাওয়া গেছে এ প্লাস্টিক কণা। এসব কণা জমা হওয়ার পর মানব শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তা জানতে বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০ বছর ধরে উদ্বিগ্ন। ইতালির কাসের্তায় অবস্থিত ক্যাম্পানিয়া লুইগি ভ্যানভিটেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক জিউসেপ পাওলিসো এবং তার সহকর্মীরা জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো চর্বির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এসব কণা চর্বির সঙ্গে যুক্ত হয়ে রক্তনালিতে ‘প্লাক’ নামক একটি অংশ তৈরি করে। এ দলটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৫৭ জনের ঘাড়ের ধমনি থেকে এ প্লাক অপসারণ করে। এর ফলে তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণার প্রধান লেখক এবং ইতালির নেপলসের ক্যাম্পানিয়া লুইগি ভ্যানভিটেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ওষুধের অধ্যাপক ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক রাফায়েল মারফেলা জানান, আজ পর্যন্ত আমাদের গবেষণাই প্রথম, যা প্লাস্টিক দূষণকে মানব রোগের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি জার্নালে প্রকাশ করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের রোগে আক্রান্তদের মলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েদের প্লাসেন্টায় মাইক্রো প্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক চর্বির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে প্লাক তৈরি করে তা রক্তনালির দেয়ালে আটকে থাকে। এমন রোগীদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর সম্ভাবনা সাড়ে চার গুণ বেশি। গবেষণায় ৩১২ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের ঘাড়ের ধমনি থেকে ওই প্লাক অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে গত শনিবার এক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেন মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষকদের কয়েকজন। তারা সম্প্রতি মানব মস্তিষ্কের ভেতর মাইক্রোপ্লাস্টিক আবিষ্কার করেছেন। তারা বলেছেন, মানুষের শরীর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্প্রতি জানা গেছে। আমরা মনে করি এর প্রভাব আমাদের সময়ে স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য প্রকট হয়ে উঠবে। ধনী বা দরিদ্র তা বিবেচ্য নয়, এই ধরনের নতুন দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার বিকল্প নেই।
কিছু প্রশ্ন
বোস্টন কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গ্লোবাল পাবলিক হেলথ অ্যান্ড দ্য কমন গুড ও গ্লোবাল অবজারভেটরি অন প্ল্যানেটারি হেলথের ডিরেক্টর শিশু বিশেষজ্ঞ ড. ফিলিপ ল্যান্ডরিগান বলেছেন, গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, মানুষের হৃদরোগের কারণ হতে পারে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক। প্লাক টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিকের সন্ধান একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার, যা জরুরি প্রশ্ন উত্থাপন করে। যেমন- মাইক্রো এবং ন্যানোপ্লাস্টিক হৃদযন্ত্র ছাড়া কোন অঙ্গে পাওয়া যায়? আমরা কীভাবে প্লাস্টিকের শরীরে প্রবেশ কমাতে পারি?
বিজ্ঞানী কিম্বার্লি ওয়াইজ হোয়াইট সিএনএনকে বলেন, ব্যাপকভাবে জানা যায়, সাইকেলের হেলমেট এবং রক্তের ব্যাগ থেকে শুরু করে পানির পাইপ এমন অনেক যন্ত্র প্লাস্টিক কণার উৎস। আমাদের পরিবেশে এসব উৎস কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্লাস্টিক নির্মাতাদের লক্ষ্য রয়েছে। তারা ২০৪০ সালের মধ্যে সব প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার বা পুনরুদ্ধার করবে। এটি নিশ্চিত করতে আমরা অবকাঠামোগত উন্নতিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছি।
সিএনএন জানাচ্ছে, গবেষকরা গর্ভবতী ইঁদুরের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন, প্লাস্টিকের কণা খাওয়ার বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে নেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর বিকাশমান ভ্রুণের মস্তিষ্ক, হার্ট, লিভার, কিডনি এবং ফুসফুসে প্লাস্টিকে উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রো এবং ন্যানোপ্লাস্টিক কোষের ক্ষতি এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যান্য প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের কণা হৃদস্পন্দন পরিবর্তন এবং কার্যকারিতায় বাধা দিতে পারে। ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃতের টিস্যু, প্রস্রাব, মল, মায়ের দুধ এবং প্লাসেন্টায় পাওয়া গেছে।
ধূলিকণার চেয়েও ছোট
মাইক্রোপ্লাস্টিক পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের টুকরো যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায়। তবে ন্যানোপ্লাস্টিক ধূলিকণার চেয়েও ছোট এবং প্রায়শই প্লাস্টিক উৎপাদনের উপজাত হিসেবে তৈরি হয়। মানুষের শরীরে ন্যানো প্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা গত কয়েক বছর ধরে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে শরীরকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, প্লাস্টিক মানব শরীরের বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকে। যা অপরিচিত বা ‘এলিয়েন পার্টিকেল’। এর ফলে প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্লাস্টিক মানুষের টিস্যুতে অবস্থান করে। এতে বিষাক্ত যৌগ তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার উট্রেখটের মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষক নিয়েনকে ভ্রসেকোপ বলেন, তিনি দেখেছেন যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসা রোগপ্রতিরোধক কোষগুলো দ্রুত মারা যায়।
আরেক ডাচ গবেষক বারব্রো মেলগার্ট পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম ফুসফুসের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। গ্রোনিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্বাসযন্ত্রের অধ্যাপক মেলগার্ট বলেন, নাইলন ফুসফুসের কাঠামোর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বলে মনে হচ্ছে। তবে মেলগার্ট এখনো বুঝতে চেষ্টা করছেন, কীভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক জীবন্ত কোষকে প্রভাবিত করে। আগের এক গবেষণা বলছে, নাইলন কারখানার কর্মীদের ফুসফুসে ব্যাপক ক্ষয় দেখা গেছে।
