২৩ বছর পর নাকে শ্বাস নিলেন আমিনুল

  • অপারেশনে রাজি হয়নি থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার হাসপাতাল
  • সিঙ্গাপুরে চেয়েছিল ২ কোটি দেশে হলো ৪ লাখে
আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৪, ১১:১২ এএম

১৯৮৫ সালে ১২ বছর বয়সে ফুটবল খেলতে গিয়ে মুখে আঘাত পান যশোরের দত্তপাড়ার আমিনুল। কিছুদিনের মধ্যেই তার মুখে টিউমারের মতো গোটা তৈরি হলে তার বাবা আক্কাজ শেখ তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের দেখান। চিকিৎসায় উন্নতি হয়নি; তার মুখের টিউমার এতটাই বড় হতে থাকে যে, দেখলে মনে হতো এক শরীরে দুই মাথা।

চিকিৎসকদের পরামর্শে একই বছর আক্কাজ শেখ ছেলে আমিনুলকে নিয়ে কলকাতায় যান এবং সেখানের একটা হাসপাতালে তিনটি অপারেশন করে তার টিউমার অপসারণ করা হয়। কিন্তু বিধিবাম। অপারেশনের কিছুদিন পর আমিনুলের ইনফেকশন থেকে টিউমারের আকৃতি আবার বাড়তে থাকে। এরপর কেটে গেছে ৩৮ বছর। দিনে দিনে আমিনুলের মুখের আকৃতি বেড়েছে। তার মুখে পোকা জমতে শুরু করে, দুর্গন্ধে কেউ পাশে ভিড়ত না। ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হচ্ছিল না।

এ অবস্থাতেই ২০০০ সালে বিয়ে হয় আমিনুলের। ২০২০ সালে তার বাবার মৃত্যু হয়। আক্কাজ শেখ ছেলেকে সুস্থ না দেখেই পরপারে চলে যান। আমিনুলের সন্তান সম্রাট বড় হয়ে বাবার চিকিৎসার জন্য ফাইল নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে এবং চিকিৎসকদের চেম্বারে চেম্বারে ঘুরতে থাকেন। দেশে ব্যর্থ হয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। সবাই আমিনুলের সমস্যাটিকে জটিল আখ্যায়িত করে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল চিকিৎসার জন্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানায়। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী সম্রাট ওই ক্যাডেট কলেজেরই বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এবং খ্যাতনামা চিকিৎসক জাহিদ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বাবার চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব ফাইল তাকে মেইল করেন। ডা. জাহিদ আমেরিকান সরকারের হিউম্যানিটি অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত চিকিৎসক। তিনি সব জেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার সামন্তলাল সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমিনুলকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। গত ২৪ জানুয়ারি তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়।

 ‘৩৮ বছর পর বাবা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ২৩ বছর পর বাবা নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারছেন। এখন আমার কি যে আনন্দ হচ্ছে, বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’

গত বৃহস্পতিবার ইনস্টিটিউটের ১৩৩৫ নম্বর কেবিনে কথা হয় সম্রাটের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আব্বাকে দেশের বড় বড় চিকিৎসক ও হাসপাতালে দেখিয়েছি। আব্বার সমস্যা এতই গুরুতর ছিল যে কেউ অপারেশনে সাহস করেনি। বিদেশের হাসপাতালও সমস্যার জটিলতার কথা বলেছে। সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতাল জানিয়েছিল, চিকিৎসায় প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ হবে। খরচ জোগাতে আমরা নিঃস্বই হয়ে যেতাম। অবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরামর্শে বার্ন ইনস্টিটিউটের ডা. প্রদীপ চন্দ্র দাসের কাছে যাই এবং ভর্তি করি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি আব্বার সার্জারি সম্পন্ন হয়; আব্বা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।’

তিনি বলেন, ‘৩৮ বছর পর বাবা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ২৩ বছর পর বাবা নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারছেন। এখন আমার কি যে আনন্দ হচ্ছে, বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’

সম্রাট বলেন, ‘গত বছর আব্বার মুখ থেকে ২০০ পোকা বের করা হয় ঢাকার একটি হাসপাতালে। দুর্গন্ধে তার কাছে যাওয়া যেত না। আমরা কোনো আশা দেখছিলাম না। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সিঙ্গাপুর, প্রিন্সেস কোর্ট হাসপাতাল মালয়েশিয়া, থামসেট ইউনিভার্সিটি থাইল্যান্ডের চিকিৎসকরা জানান, অপারেশন খুব ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সিঙ্গাপুর জানায়, অপারেশন ও চিকিৎসায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা খরচ হবে। এ খরচ জোগাতে গেলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যেতাম। অথচ দেশে মাত্র চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। চিকিৎসার জন্য আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অনুদান চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমার বাবাকে নতুন জীবন দিলেন, আমাদের পরিবারকে নিঃস্ব হওয়া থেকে রক্ষা করলেন।’

aminul-2

গত শনিবার বার্ন ইনস্টিটিউটে আমিনুলকে দেখতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্তলাল সেন। তিনি তার সার্বিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা দেশের চিকিৎসকদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ। আমাদের চিকিৎসকদের সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই রোগীর চিকিৎসার ফলে রোগীদের আস্থা বাড়বে, ডাক্তারদের সাহস বাড়বে। এটাই অনুপ্রেরণা। আমি রোগীকে দেখে এসেছি, তিনি সুস্থ আছেন।’

কথা হয় সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ চন্দ্র দাসের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামন্তলাল স্যার আমাকে নির্দেশ দেন আমিনুলের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। তার নির্দেশে আমরা রোগীর চিকিৎসায় একটা মেডিকেল বোর্ড গঠন করি। বোর্ডে আমাদের ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরাও ছিলেন। আমিনুলের সমস্যা ছিল মারাত্মক। তার টিউমারটা এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল যে, অপারেশন করা ছিল দুরূহ। আমরা শুরুতেই ধারণা করি তার টিউমার থেকে ইনফেকশনটা হয়তো তার হাড্ডিতেও ছড়িয়েছে। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব রিপোর্ট দেখে যা বুঝলাম, টিউমার থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। টিউমারের কারণে তার মুখের অন্যান্য মাংস ও চামড়া হাড়ে পরিণত হয়। নিশ্চিত হতে তাকে বেশ কিছু টেস্ট করাতে হয়। প্রয়োজন ছিল আক্রান্ত স্থানের মাংস নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করা। এ মাংস নিতে হলে অপারেশনের বিকল্প ছিল না। কিন্তু তা সম্ভব ছিল না, ফলে আমরা কালচার করে সমস্যার বিষয়টি জানার চেষ্টা করি। ৩৮ বছরের ইনফেকশনের কারণে তার চোয়ালের হার নষ্ট হয়ে একদম ব্রেনের নিচ পর্যন্ত, অন্যদিকে বাম চোখ ও মুখের তালু পর্যন্ত চলে গেছে। এ ধরনের রোগীর হাড়ে ইনফেকশন হলে হাড় ফেলে দিতে হয়। কিন্তু আমিনুলের ইনফেকশন এতটাই বিস্তৃত ছিল, ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়া হাড় ফেলে দিতে হলে তার মুখের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।’

ডা. প্রদীপ বলেন, ‘এরপরও আমরা ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন করি, আমরা ইনফেক্টেড হাড়ের ৯০ শতাংশ ফেলে দিয়ে ১০ শতাংশ রাখতে বাধ্য হই। আর কেটে ফেলা স্থান শরীরের অন্য অংশ থেকে মাংস নিয়ে মেশিন দিয়ে পূরণ করেছি। মাংসের মধ্য দিয়ে ইনফেক্টেড হাড়ে রক্ত গেলে এবং আগামী ৪-৬ মাস রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে অবশিষ্ট হাড় থেকে ইনফেকশন নষ্ট হয়ে যাবে। এ মুহূর্তে রোগী ৯০ শতাংশ ঝুঁকিমুক্ত, ১০ শতাংশ রিস্ক কিন্তু থেকেই যায়।’

আমিনুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩৮ বছর পর মুক্ত জীবনের স্বাদ পেলাম। নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারলাম। এখন স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারছি। মনে হচ্ছে নতুন করে পৃথিবীতে আমার আগমন ঘটেছে। মনে হয়েছিল এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও চিকিৎসকদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

আমিনুলের চিকিৎসায় কত টাকা খরচ হয়েছে, এমন প্রশ্নে ডা. প্রদীপ বলেন, ‘আমাদের ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা করাতে কোনো খরচ হয় না। ১০ টাকায় টিকিট কেটে ৩৫ টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়া যায়। এর বাইরে কেবিন চার্জ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অল্প কিছু খরচ হয়েছে। খরচের অঙ্ক খুব বড় না। অথচ দেশের বাইরে গেলে কোটি টাকা খরচ হতো। আমি দেশের মানুষকে অনুরোধ করব, দেশের বাইরে যাওয়ার আগে একবার খবর নেবেন, রোগের চিকিৎসা দেশে আছে কি না। অনেক টাকা খরচের হাত থেকে, ভোগান্তি থেকে বেঁচে যাবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত