দগ্ধদের কেউই শঙ্কামুক্ত না স্বজনের চোখেমুখে ভয়

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৪, ০১:৪৫ এএম

ফাগুনের আকাশ কালো করে দুপুরের পর নামল বৃষ্টি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হঠাৎ যখন বৃষ্টি নামে, তখন রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পঞ্চমতলা থেকে দূরের দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু হঠাৎ রোদ হারিয়ে নামা বৃষ্টি চোখে পড়ে না নাজমা বেগমের। তার চোখ আগেই ঝাপসা হয়ে আছে স্বামীকে হারানোর শঙ্কায়। অনেকক্ষণ ধরেই মুখ লুকিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। অনেকের ভিড়ে তাই তাকে চোখে পড়ে আলাদাভাবেই। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গত বুধবার সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধদের একজন কুদ্দুস মিয়ার (৪৫) স্ত্রী নাজমা বেগম। উপজেলার তেলিরচালা এলাকার ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হন কুদ্দুসসহ অন্তত ৩৬ জন। যাদের ৩২ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছয়জনই রয়েছে আইসিইউতে।

নাজমা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু পেটের একপাশ ছাড়া তার (কুদ্দুস মিয়া) পুরো শরীর পুড়ে গেছে। কথা বলতে পারছেন না। তার কত কষ্ট লাগছে সেটা আল্লাহ জানেন। কথা বলতেও পারছেন না। ডাক্তাররা বলছেন, তার অবস্থা ভালো না। তার কী হবে আমরা জানি না।’

কুদ্দুস মিয়ার বড় ভাই দুদু মিয়া ছিলেন হাসপাতালে। মন ভার করে বসে ছিলেন পঞ্চমতলার একপাশে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেইলি লেবার হিসেবে কাজ করেন কুদ্দুস। স্ত্রীও কাজ করেন একটি প্রতিষ্ঠানে। তাদের সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু সেদিন সিলিন্ডারের আগুনে সবকিছু মনে হয় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাদের দুই সন্তান আছে। মেয়ে একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে এসএসসি পাস করেছে।

দুদু মিয়ার মতো কারও কারও ভাই কারও ছেলে, কারও স্বামী কিংবা কারও মা-বাবা, শরীরে পোড়া যন্ত্রণা নিয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বিছানায়। বাইরে সেই কষ্ট বুকে নিয়ে অপেক্ষায় তাদের স্বজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দুলু খাতুন। তার স্বামী জহিরুল ইসলামের (৩০) শরীরের ৫৮ শতাংশ দগ্ধ। তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ভেড়াকোলা গ্রামে। কালিয়াকৈরের তেলিরচালা এলাকার শফিকের ওই টিনশেড বাড়িতে তিন মেয়ে নিয়ে ভাড়া থাকতেন তারা। জহিরুল ইসলাম মাছ বিক্রেতা আর দুলু খাতুন নিজে সোয়েটার কারখানায় চাকরি করেন।

দুলু খাতুন বলেন, ‘আমি কারখানায় ছিলাম। বিকেলে যখন বাসায় যাই তখন আগুনের খবর শুনতে পাই। গেটের সামনেই লেগেছিল আগুন। আর গলির ভেতরে আমার মেয়েরা আটকে পড়েছিল। তখন দৌড়ে গিয়ে মেয়েদের বাইরে বের করি। তবে আমার স্বামীকে কোথাও পাচ্ছিলাম না। পরে কোনোপাড়ায় একটি হাসপাতালে গিয়ে তাকে খুঁজে পাই। সারা শরীর পুড়ে গেছে, কোথাও বাদ নেই। রাতটুকু ভালো ছিল কিন্তু সকাল থেকে চেহারা, শরীর ফুলে গেছে। তার কিছু হলে আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাব।’

কেউই শঙ্কামুক্ত নন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বার্ন ইনস্টিটিউটে দগ্ধদের চিকিৎসায় দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ ৩২ জন ভর্তি আছেন। দগ্ধদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী শিশু ৭ জন, ১১-১৮ বছর বয়সী ৬ জন। শিশুদের শরীরের ১০ শতাংশ পুড়লেই গুরুতর বলে ধরে নেওয়া হয়। দগ্ধদের মধ্যে ১৬ জনের বেশি ব্যক্তির শরীরের ৫০ শতাংশের বেশি পুড়েছে। ১০ জনের বেশি ব্যক্তির শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। দগ্ধ সবার অবস্থাই খারাপ। সবারই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার সার্বিক বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন এবং এই চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় তিনি নিজে বহন করবেন বলে জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ রোগীদের শারীরিক কষ্ট অনেক। প্রতিটি রোগীকে নিজের পরিবারের সদস্যদের মতো করে আমাদের সবাইকে চিন্তা করতে হবে। দগ্ধ রোগীদের অনেকেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আমরা কিছু রোগীকে হয়তো বাঁচাতে পারব না, কিন্তু কোনো রোগীর প্রতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের চেষ্টার যেন কোনো রকমে অবহেলা না থাকে এটি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

তদন্ত কমিটি গঠন : কালিয়াকৈরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এই অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ওই তদন্ত কমিটির কথা জানান গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মো. সফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হুমায়ুন কবিরকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার আহাম্মেদ ও গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল আরিফিন। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, খুবই ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় যারা থাকেন, তাদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভিজ্ঞতা কম। যার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দিয়ে অগ্নি মহড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। এ ছাড়া অগ্নিদগ্ধদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে এবং সার্বক্ষণিক তাদের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, এজন্য জনসচেতনতা প্রয়োজন। আইনের কাঠামো থেকে যারা এর ব্যত্যয় ঘটাবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে যারা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করে তাদের ডিলারশিপ ঠিক আছে কি না সেগুলো দেখা হবে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন ঢামেক ও কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত