কৌশলী খুনি বটে

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ১২:০৮ এএম

কোনো ঘটনাই কারণ ছাড়া ঘটে না। হত্যাকা-ের মতো ঘটনায় থাকে বহুমাত্রিক কারণ। অপরাধবিজ্ঞানে একটা কথা আছে ‘অপরাধী তার অপরাধের প্রমাণ কখনই নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে প্রকৃত খুনি চিহ্নিত হবেই।’ তবে সেই অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। আমরা সাধারণ মানুষ জানি না কোন খুনের, কে খুনি? কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে। তারপরও দেখা যায়, হাজার হাজার খুনের মামলা ঝুলে রয়েছে বছরের পর বছর। এর কারণ কী হতে পারে? রাজনৈতিক প্রভাব অথবা অর্থযোগের কারণে খুনি চিহ্নিত হলেও তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয় না? বিষয়টি কি এরকম!

১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ঢাকা-চিটাগাং রোডের মুক্তি সরণির পাশেই মিজমিজি গ্রামে যাওয়ার কাঁচা রাস্তার মোড়ে একটি লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ বুঝতে পারে, কেউ তাকে হত্যা করেই ফেলে রেখেছে। কিন্তু কেন? এই মেয়েই বা কে?  দেশব্যাপী রব ওঠে খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। কোনোভাবেই যেন আইনের ফাঁক গলে  বেরিয়ে যেতে না পারে সন্ত্রাসী, সেই দাবিতে চলে নানা সেøাগান প্রতিবাদ। পুলিশ সূত্রে পরিচয় মেলে মেয়েটির। নাম শারমিন রীমা। শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন হোসেনের মেয়ে। যাকে বিয়ের মাত্র ৪ মাসের মাথায় নির্মমভাবে হত্যা করে তারই স্বামী। খুকুর সঙ্গে পরকীয়ায় আসক্ত মুনীরকে ১৯৯০ সালের ২১ মে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় মুনীর ও খুকুকে। পরে মামলাটি আবার হাইকোর্টে উঠলে আদালত মুনীরের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখলেও খুকুকে বেকসুর খালাস দেয়। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুনীরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এরপর অনেক সময় গড়িয়েছে। তারপর হাজার হাজার খুনের বিচার হয়নি। সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুনের রহস্য উদঘাটিত হয়নি। পুলিশ জানতে পারেনি, আইনজীবীর স্ত্রী বিবি রহিমার খুনি কারা? চাঞ্চল্যকর অসংখ্য হত্যা মামলার তদন্ত এখন হিমাগারে। ফলে নির্মম খুনের শিকার পরিবারগুলোতে হতাশা বাড়ছে। আড়ালে থেকে গেছে খুনিচক্রের সদস্য। আর আলোচিত সাগর-রুনি খুনের বিচার তো দূরের কথা, চার্জশিটও হয়নি। অথচ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সাগর-রুনি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন। এ পর্যন্ত ১০৬ বার সময় বৃদ্ধি করেও সফল হতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গত জানুয়ারিতে ১০৭ বারের মতো সময় বৃদ্ধি করেছে আদালত। দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত হয়েছে, ‘খুনিরা ৯ বছরেও অজানা’ প্রতিবেদন। বলা হচ্ছে- চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের সিনিয়র শিক্ষক অঞ্জলী দেবীকে ৯ বছর আগে ৪ যুবক কুপিয়ে হত্যা করেছিল। নগরীর চকবাজার তেলিপট্টি মোড়ের উর্দু গলিতে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই শিক্ষককে কুপিয়ে রামদা ব্যাগের ভেতরে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা। এই যুবকরা কে, কেন হত্যা করা হয়েছে, অঞ্জলীকে হত্যার পেছনে কারা রয়েছে, সেই রহস্যের কিনারা হয়নি আজও। সর্বশেষ তদন্তভার পাওয়া সংস্থা অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, চাঞ্চল্যকর অঞ্জলী খুনের রহস্যের কিনারা করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। তার মতে, আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলেছে অন্ধকারে হাতড়ানোর মতো। ঘটনার শুরুতে যদি তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করা হতো, তাহলে খুনিদের শনাক্ত করা যেত। অঞ্জলী হত্যা মামলার সবশেষ ধার্য তারিখ ছিল চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। এর পরবর্তী তারিখ ২৫ মার্চ। ৯ বছর ২ মাসে আদালতে প্রতিবেদন জমার তারিখ পড়েছে ১৫২টি।

দেশে অনেক খুন হয়েছে, হচ্ছে। বিচার না হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যুগে আমরা বসবাস করছি- এমন কথা বলছি না। তবে কিছু প্রশ্ন তো থেকেই যায়। যদি কোনো খুনের বিচার না হয়, যদি অপরাধী শাস্তি না পায়, যদি আইনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে যায় তখন নির্ভরতার কিছু থাকে না। এইরকম পরিস্থিতি কি জাতির জন্য কল্যাণকর? কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে? কর্তৃপক্ষ যদি বিষয়টি উপলব্ধি করেন, তাহলে ভালো। আর না করলে, সমস্ত দায়ভার কর্তৃপক্ষের কাঁধেই বর্তায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত