একদিকে দেশের কৃষকের সংখ্যা গুণিতক হারে কমছে, অন্যদিকে কৃষিতেই লাভ বেশি দেখছে সরকার। কোন পেশায় কত আয় তা অনেকেরই অজানা। তবে সেটিরও সমাধান দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। খাদ্য নিরাপত্তা জরিপ ২০২৩-এ সংস্থাটি বলছে, মৌসুমি ফসল চাষ করে কৃষকের আয় সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, কেউ যদি নিজের জমি না থেকেও অন্যের জমিতে শ্রম দেন, সেই কৃষি শ্রমিকের আয় কৃষি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
বিবিএস বলছে, কৃষি খাতে মাসে গড় আয় ৫ হাজার ২৭৫ টাকা। এর মধ্যে মৌসুমি ফসল বিশেষ করে ধান, পাট, গম, আলু, সবজি ইত্যাদিতে আয় সর্বোচ্চ, ২ হাজার ২৩ টাকা।
খাদ্য নিরাপত্তা জরিপে সংস্থাটি প্রথমে আয়ের শতাংশ দেখিয়েছে। কৃষি আয়ের উৎস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অস্থায়ী ফসল বা মৌসুমি ফসলে আয় পরিবারের মোট কৃষি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। প্রকৃতপক্ষে মোট কৃষি আয়ে জাতীয় পর্যায়ে অস্থায়ী ফসল বা মৌসুমি এসব ফসলের অবদান ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় কৃষিতে আয় কম, এসব এলাকায় অন্যান্য উৎস থেকে আয় সর্বোচ্চ ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষিতে আয়ের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হলো কৃষিশ্রম, যা জাতীয় পর্যায়ে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ, গ্রাম এলাকায় ২০ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই কৃষি আয়ের তৃতীয় প্রধান উৎস হলো পশুপালন। গ্রাম এলাকায় এ উৎসের অবদান ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যেখানে শহর এলাকায় এর অবদান ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এলাকাভেদে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতি মাসে কৃষি এবং অকৃষি খাত থেকে খানার আয়ের তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে, পরিবারপ্রতি সবচেয়ে বেশি মাসিক আয় (২ হাজার ২৩ টাকা) হয় অস্থায়ী ফসল (ধান, পাট, গম, আলু, সবজি ইত্যাদি) থেকে। তারপর কৃষি শ্রমিকদের আয় ১ হাজার ৬৮ এবং পশুপালন ৯১৫ টাকা। পরিবারপ্রতি মাসিক সবচেয়ে কম আয় হয় স্থায়ী ফসল (বন) থেকে, যা মাত্র ৬৪ টাকা।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্যান্য খাত থেকে সবচেয়ে বেশি ৩২৭ টাকা আয় করে, তারপর যথাক্রমে মৌসুমি ফসল ধান, পাট, গম, আলু, সবজি ইত্যাদিতে ২৬৮ এবং পশুপালনে ১৬১ টাকা।
দেশের কৃষির সম্ভাবনা অনেক। উৎপাদনও বাড়ছে সময় গুনে গুনে। কিন্তু যারা খাদ্য উৎপাদন করেন সেই কৃষকই সবচেয়ে বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। সরকারি তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সব মিলিয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে কৃষি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কারণে গত এক বছরে কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় ১৬ লাখ কৃষক। এর প্রভাবও পড়েছে দেশের মোট উৎপাদন বা জিডিপিতে।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উৎপাদিত ফসল মাঠেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে, কৃষক যে খাদ্য ফলান, একটা পর্যায়ে গিয়ে সে খাদ্যই বেশি মূল্যে কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩-এ বলা হয়েছে, পেশাগত জায়গায় শুধু কৃষি খাতের শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বাণিজ্যিক কৃষি খামার স্থাপন করেছেন রংপুরের মো. আবদুস সালাম। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। তিনিও জানালেন কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেশি। এ কৃষকের মতে, কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে যারা কৃষি উৎপাদন করেন, অনেক জোগানও দেন তারা। আর্থিক অসচ্ছলতা ও নিজের খাদ্য মজুদের জায়গা না থাকায় উৎপাদিত ফসল মাঠেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সিন্ডিকেট ও ফড়িয়ারা তাদের এসব পণ্য মাঠে থাকতেই কিনে নেয়। ফলে কৃষকের যখন খাবারের প্রয়োজন হয়, তখন তিনি তাদের কাছ থেকে অনেক বেশি দামে কিনে খেতে হয়।
কৃষকরা যেহেতু অল্প আয়ের মানুষ, তাদের কমই কিনতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার এটি একটি বড় কারণ।
