কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯ বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ১৫ ঘণ্টার পর চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। চট্টগ্রামগামী ডাউন লাইন দিয়ে দুদিকের ট্রেন চলাচল করছে। দুর্ঘটনার শিকার আপ লাইন ঠিক হতে আরও দু-এক দিন সময় লাগবে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পরই দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পূর্বাঞ্চল রেল কর্তৃপক্ষ।
পূর্ব রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আনিসুর রহমানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি আজ মঙ্গলবার কাজ শুরু করবে। সরেজমিনে তদন্ত করবেন তারা। তাদের সাত দিনের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। আরেকটি কমিটি কখন তদন্ত করবে জানা যায়নি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞা বলেছেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গরমের কারণে রেললাইন বাঁকা হওয়ার সত্যতা মেলেনি। ধারণা করা চলে, ২০৮ নম্বর রেলওয়ে সেতুর নড়বড়ে কাঠের সিøপার ও নাট-বল্টুতে ত্রুটি থাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। কী কারণে ট্রেনটির ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে তা জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করছি, প্রতিবেদনে সঠিক কারণ জানা যাবে।’
সরেজমিনে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেলপথটির হাসানপুর রেলস্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার পুবে ঢালুয়া ইউপির তেজের বাজার এলাকার ২০৮ নম্বর সেতু। সেতুটিকে স্থানীয়রা ভেঙির পুল নামে জানেন। দীর্ঘদিন এটির রক্ষণাবেক্ষণ ছিল না; সেতুতে ব্যবহৃত তক্তাগুলোও পুরনো হয়ে গিয়েছিল। সেতুর অধিকাংশ নাট-বল্টু নষ্ট ছিল। রবিবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের সময় বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন বেপরোয়া গতিতে ত্রুটিপূর্ণ সেতু পার হওয়ার সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের লক ভেঙে গিয়ে সেটি প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে চলে যায়। অবশ্য পরে চালক ইঞ্জিনটিকে হাসানপুর স্টেশন নিয়ে রাখেন।
ট্রেনের ১৮টি বগির ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। আপ এবং ডাউন লাইনের ওপর সেগুলো পড়ে। আপ লাইনের ৩০০ মিটার রেলপথ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চারটি কোচেরও বেশ ক্ষতি হয়। রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে চট্টগ্রাম ও আখাউড়া থেকে দুটি উদ্ধারকারী ট্রেন এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
১০০ শ্রমিক রাতভর কাজ করেন। তারা চট্টগ্রামগামী ডাউন লাইন সচল করেন। এতে ১৫ ঘণ্টা পরে চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহের রেলপথ। এ ঘটনায় শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে অনেক ট্রেনের। যাত্রা বাতিল করা হয় কয়েকটি ট্রেনের। আটকে থাকা ট্রেনের মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস হাসানপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যায় ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে, চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে, সিলেট থেকে ছেড়ে আসা পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ৫টা ১৫ মিনিটে, চট্টলা এক্সপ্রেস ৫টা ৫৪ মিনিটে ও কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন ৬টা ৫০ মিনিটে হাসানপুর রেলস্টেশন অতিক্রম করে। বর্তমানে ডাউন লাইনে দুদিকের ট্রেন চলাচল করছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিজয় এক্সপ্রেস খুব বাজেভাবে লাইনচ্যুত হয়েছে। উদ্ধারকাজ শেষ হতে দু-এক দিন সময় লাগতে পারে। আপাতত ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। দুই লাইনের ট্রেনই ডাউন লাইন দিয়ে চলাচল করবে। আপ লাইন একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। নতুন করে লাইন তৈরি করার প্রয়োজন পড়তে পারে। কবে নাগাদ তা ঠিক করা যাবে তা নির্দিষ্ট করে বলা দায়। তবে গরমের কারণে রেল বেঁকে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে প্রমাণ মেলেনি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারাই লাইনচ্যুতের কারণ জানাবেন। মঙ্গলবার তদন্ত শুরু হবে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাদিউজ্জামান বলেন, ‘৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেললাইন বেঁকে যাওয়ার কথা নয়। অন্য কারণ থাকতে পারে। সম্ভবত সংশ্লিষ্ট অংশের লাইন পুরনো হয়ে গিয়েছিল। ফলে লাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।’
রবিবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে নাঙ্গলকোটের হাসানপুর স্টেশনসংলগ্ন ঢালুয়া ইউনিয়নের তেজের বাজার এলাকায় বিজয় এক্সপ্রেসের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে আহত হয়েছে অন্তত ২৫ জন। চ্যুত বগিগুলো রেলপথের উভয় লাইনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অনেকগুলো ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন।
ক্যাপশন
১. ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে হাসানপুর রেলস্টেশন অংশে সচল হওয়া ঢাকামুখী ডাউন লাইন
২. ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে হাসানপুর রেলস্টেশন অংশের ২০৮ নম্বর ভেঙির পুল
