দ্বিতীয় জন্মদিনে বাবা-মার হাত ধরে হাঁটছে নুহা ও নাবা

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪, ০৫:০৯ পিএম

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা হওয়া জোড়া শিশু নুহা ও নাবার আজ দ্বিতীয় জন্মদিন। আলাদা হওয়ার পর এখন ওরা হাসছে, খেলছে, খাচ্ছে, কথা বলছে। মা-বাবা বলে ডাকছে। হাসপাতালের কেবিনে বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটছে, আনন্দে নাচছে শিশু দুটি।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের কেবিন ব্লকে ৬১৮ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা গেল নুহা-নাবা, ওর বাবা-মাকে। আনন্দে উদ্বেলিত ওদের বাবা-মা। ওদের প্রথম জন্মদিন ছিল জোড়া লাগানো অবস্থায়, এই হাসপাতালেই, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায়। তখন শিশু দুটির বাঁচা-মরার প্রশ্নে চিন্তিত সবাই। জন্মদিনের কোনও অনুভূতি ছিল না। আনন্দ ছিল না।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএমএমইউয়ের চিকিৎসকরা জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করেন জোড়া লাগানো শিশু নুহা ও নাবাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অনুষদের ডিন ও নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেনের নেতৃত্বে সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে অংশ নেন ৩৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ শতাধিক মেডিকেল টিমের সদস্য।

desh-rupantor

সন্তানদের দ্বিতীয় জন্মদিনের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে নুহা ও নাবার বাবা আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম জন্মদিনের থেকে দ্বিতীয় জন্মদিনের অনুভূতি অনেক ভালো। প্রথম জন্মদিনের সময় ওরা জোড়া লাগানো ছিল। জন্মদিনের আনন্দ ছিল না। জন্মদিন ভাবার মতো কোনও পরিস্থিতি ছিল না। এবারের অবস্থা ভিন্ন। এখন ওরা আলাদা। সন্তান দুটির বাঁচার স্বপ্ন দেখছি। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে।

আলমগীর হোসেন বলেন, ওদের মা খুশী, যথেষ্ট খুশী। কষ্ট তো আমার থেকে ও বেশি করেছে। আমি তো দু’একবার বাসায় গিয়েছি। ও তো দুই বছর টানা হাসপাতালেই। ওর কষ্টের তুলনা হয় না।

নুহা ও নাবা এখনো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন। বর্তমানে আছে কেবিন ব্লকের ৬১৮ নম্বর কক্ষে। আরও তিন মাস থাকতে হবে হাসপাতালে। মলদ্বার প্রতিস্থাপনের জন্য আরও একটি অস্ত্রোপচার করতে হবে।

বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, জন্মের পর থেকেই ওরা হাসপাতালে। জন্মের ১৪ দিনের মাথায় এই হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেই থেকে এই হাসপাতালেই। প্রথম জন্মদিনও এই হাসপাতালে। দ্বিতীয় জন্মদিনও এই হাসপাতালে। আল্লাহর রহমতে এখন সুস্থ আছে। ধরে হাঁটতে পারে। খাওয়া দাওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসকরা বলেছেন, ওরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।

জন্মের ১৪ দিনের মাথায় ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল নুহা ও নাবাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন বাবা-মা। অস্ত্রোপচার হয় এই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি। চিকিৎসকরা জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দুটিকে আলাদা করেন। সেই থেকে ওরা দিন দিন সুস্থ হয়ে উঠছে।

নুহা ও নাবার বাবা আলমগীর হোসেন রানা একজন পরিবহন শ্রমিক। মা নাসরিন আক্তার গৃহবধূ। বাড়ি কুড়িগ্রাম সদরে। এটা তাদের দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান একটা ছেলে। বয়স ১০ বছর। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর আট বছর বয়সে নুহা নাবার জন্ম হয়। গত দু’বছর ধরে সেই ছেলেও সবার সাথে হাসপাতালেই আছে।

‘গত দুই বছর ধরে আমি কিছুই করি না। বাচ্চাদের পেছনে এই হাসপাতালেই আছি’- বলেন আলমগীর হোসেন।

‘প্রথম আট মাস ওয়ার্ডে ছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিল না। তখন আমাদের পাঁচ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। দুটি জমি ছিল। সেগুলো বন্ধক রাখি। ঋণ করি। এরপর প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেন। এখন শুধু ব্যক্তিগত খরচ নিজেদের বহন করতে হয়।’ 

আলমগীর হোসেন জানান, যে চিকিৎসক (অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন, নিউরো সার্জারি বিভাগ, বিএসএমএমইউ) আমাদের এখানে নিয়ে আসেন সেই ডাক্তার ব্যক্তিগতভাবে এক লাখ টাকার ওপরে দিয়েছেন। উনি আমাদের জন্য অনেক করেছেন। এখনো করছেন।

নুহা ও নাবার বাবা জানান, এই সন্তান যখন হয়, তখন থেকেই প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি। সন্তান ধারণের পর নিয়মিত স্ত্রীকে চিকিৎসক দেখিয়েছি। দুইবার আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছে। কিন্তু একবারও চিকিৎসকরা বলেননি যে শিশু দুটি জোড়া আছে। শুধু বলেছে জমজ বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা। স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রাত ১১টায় সিজার হয়। তখনো চিকিৎসকরা প্রথমে কিছু বলেননি। গোপন রেখেছেন। পরে সকালে জানায় বাচ্চা জোড়া লাগানো। পরে রংপুর মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ অথবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তারা জানান, এটা আর কোথাও হবে না।

কিভাবে এলেন এই হাসপাতালে- জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বলেন, ডা. মোহাম্মদ হোসেন স্যারের বাসা কুড়িগ্রাম। কুড়িগ্রামে উনি এক অনুষ্ঠানে যান। আমি আগেই সিভিল সার্জনকেও বলে রেখেছিলাম। সিভিল সার্জন একদিন আমাকে বলেন মোহাম্মদ হোসেন স্যার কুড়িগ্রামে আসছেন, তাকে বাচ্চা দুটিকে দেখান। আমি দেখাই। স্যার বললেন হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এই হাসপাতালে আনতে বলেন। পরের দিন নিয়ে আসি। পরে উনি সব ব্যবস্থা করে অস্ত্রোপচার করেন। সমস্ত অবদান মোহাম্মদ হোসেন স্যারের। ভিসি স্যারও আমাদের যথেষ্ট উপকার করেছেন। হাসপাতাল থেকে ভালো সাপোর্ট পেয়েছি।

এখনো তিন মাস থাকতে হবে- জানিয়ে বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, জোড়া লাগানোর পর পায়খানার রাস্তা আলাদা করা হয়েছে। এখন মলদ্বার স্থাপন করতে হবে। সেটার জন্য একটা অস্ত্রোপচার করতে হবে। এতদিন একসাথে শুয়েছিল। এখন আলাদা করায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। সেটার জন্য থেরাপি দিতে হচ্ছে।

বাবা জানালেন, ভাত, সুজি, নুডলস, ফলমুল- এখন ওরা সব খেতে পারে। স্বাভাবিক আছে। কথা বলতে পারে। বাবা মা, যা শোনে সব বলতে পারে। কথা বা কানে শোনা সব ঠিক আছে। আগেও কথা বলতে ও শুনতে পেত। শুধু সমস্যা ছিল জোড়া লাগানো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত