একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া এখন মরা খাল

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৪, ১০:৩৫ পিএম

কুমিল্লার লাকসাম-মনোহরগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী এখন পানিশূন্য। আজ থেকে ৩৫-৪০ বছর আগেও নদীটি ছিল এ অঞ্চলের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। সে সময় ডাকাতিয়া ছিল পূর্ণযৌবনা। অসংখ্য পালতোলা নৌকা, লঞ্চ ও মালবাহী ট্রলারের একমাত্র রুট।

শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা আবাদের সময় নদী থেকে পর্যাপ্ত পানি পেতেন। ছিল দেশীয় মাছের প্রাচুর্য। ডাকাতিয়া নদী ছিল বহু মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাকাতিয়া এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্যতাসংকটে বছরের অধিকাংশ সময় নদীটি বালুচরে রূপ নেয়।

খনন না করায় মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে কৃষকরা। নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহার করতে না পারায় ফসল উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে কৃষকদের। অথচ ডাকাতিয়া নদী একসময় দক্ষিণ কুমিল্লাসহ চাঁদপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলার মানুষের কাছে আশীর্বাদ থাকলেও বর্তমানে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লাকসাম-মনোহরগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, ডাকাতিয়ার বুকে এখন কোথাও ফসলের খেত, আবার কোথাও ফেটে চৌচির নদীর তলদেশ। আবার কোথাও কোথাও মাটিও কেটে নেওয়া হচ্ছে। নদীর দুই পাড়ে অবাধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণ করেছে মানুষ। বিভিন্ন স্থানে কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলে বিষাক্ত করে তুলেছে নদীটিকে।

বর্তমানে নদীটি দখল-দূষণ এবং ভরাটের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। শুকনো মৌসুমে এখন আর নদীটিতে পানি থাকে না। সেচের সময় বা বোরো মৌসুমে ডাকাতিয়া হয়ে উঠে ধু-ধু বালুচর।

ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা কাঁকড়ী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের উজিরপুর ইউনিয়নের কাশিপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ডাকাতিয়া নদী। এরপর লাকসাম-মনোহরগঞ্জ ও হাজীগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে মিশেছে এটি। নদীটির দৈর্ঘ্য ২০৭ কিলোমিটার। প্রস্থ ৬৭ মিটার (প্রায় ২২০ ফুট), যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের।

যদিও ২০৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর কোথাও বর্তমানে ২২০ ফুট প্রস্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। দখল হতে হতে নদীটি তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে বললেই হয়। ২২০ ফুটের নদীটি কোথাও ৩০, কোথাও বা ৪০ ফুটের মরা খালে পরিণত হয়েছে।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী বাপ্পি বলেন, প্রতিদিন ব্রয়লার মুরগির ব্যবসায়ীরা তাদের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলছে। এ ছাড়াও স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী দোকানের উচ্ছিষ্টসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ফেলছেন নদীতে।

লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে জন্ম হওয়ায় কত স্মৃতি জমে আছে। একসময় এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌপথ। ওই সময় বিভিন্ন পণ্যবাহী বড় বড় জাহাজ ও লঞ্চ এই নদীপথে চলাচল করত। নৌ যোগাযোগের সুবিধার কারণে শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলার লোকজন লাকসামে এসে বাণিজ্য করত। এছাড়া ছিল দেশি মাছের প্রাচুর্য। কয়েক হাজার জেলে এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে প্রভাবশালীরা নদীটি দখল করে নিচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। না হয় একসময় ডাকাতিয়া নদীর অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে নতুন ডাকাতিয়ার ১২ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। লাকসাম-মনোহরগঞ্জ অংশে খননের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাব। চলতি বছরেই কাজটি শুরু হওয়ার কথা। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান হবে বলেও জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত