ট্রেনের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও তদারকির পরও থেমে নেই কালোবাজারি। নানা কৌশলে কালোবাজারির পাশাপাশি চলছে জাল টিকিট বিক্রি। এ ছাড়া বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়ার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কম, রেলওয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ এবং ট্রেনে খাবার সরবরাহের ক্যাটারিং কর্মীদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এর ফলে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। সারা বছর তো চলেই, তবে ঈদ কিংবা অন্য কোনো উৎসবের আগে বেড়ে যায় এই সিন্ডিকেট সদস্যদের দৌরাত্ম্য।
গত বছর ১ মার্চ থেকে ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ এমন স্লোগান সামনে রেখে অনলাইনে ও অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। টিকিট ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, কালোবাজারি প্রতিরোধ, বিনা টিকিটে ভ্রমণে জরিমানা করা এবং ভাড়া আদায় সহজ করতে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও নতুন নতুন কৌশলে চলছে টিকিট কালোবাজারি।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গতবারের মতো এবারও ঈদযাত্রার কোনো টিকিট কাউন্টারে বিক্রি করা হবে না। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকেই শতভাগ টিকিট বিক্রি হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি মোবাইল ফোন থেকে সর্বোচ্চ চারটি টিকিট সংগ্রহ করার সুযোগ থাকবে। টিকিট সংগ্রহের সময় প্রত্যেক মোবাইল ফোনে আলাদা আলাদা ওটিপি যাবে। সেটি নিশ্চিত করার পরই যে কেউ টিকিট কাটতে পারবেন। ওটিপি পাঠানোর এ পদ্ধতি নতুন চালু হওয়ায় টিকিট নিয়ে কারসাজি অনেকটা কমবে বলে মনে করছেন রেল কর্মকর্তারা।
এর আগে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পর কালোবাজারি কমবে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং নতুন নতুন কৌশলে টিকিট সংগ্রহ করে যাত্রীদের কাছে চড়া দামে তা বিক্রি করছে কালোবাজারি সিন্ডিকেট। ফলে এবারের নতুন পদ্ধতিতে কালোবাজারি কতটা কমবে তা নিয়ে সংশয়ে অনেকেই।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসবে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত কিংবা তারও বেশি সময় ধরে সার্ভারে ঢোকা যায় না। আবার সার্ভারে ঢোকার পর দেখা যায় সব টিকিট বিক্রি শেষ। এ ক্ষেত্রে টিকিট বিক্রির সার্ভারটি ইচ্ছে করে ডাউন করে রাখা হয়। পাশাপাশি সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন গন্তব্যের টিকিট সংগ্রহ করে পরে তা স্টেশনে, ফেসবুকের মাধ্যমে কিংবা নানা মাধ্যমে যাত্রীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে।
সম্প্রতি ঢাকা-কক্সবাজার রুটে সরাসরি ট্রেন চালুর পর এ রুটে ট্রেনের টিকিটের ব্যাপক চাহিদা থাকায় টিকিট কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্যও বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টিকিট বিক্রি শুরুর পর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। সার্ভার ডাউনের কারণে সাইটে প্রবেশ করা যায় না। এগুলো সব সত্যি। এই টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িত। যাদের সঙ্গে সহজের লোক এবং আমাদের রেলের লোকও জড়িত। ইতিমধ্যে আমরা দুটি সিন্ডিকেটকে ধরে আইনের আওতায় এনেছি। ঠিকমতো টিকেটিং ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য সহজকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টিকিট কালোবাজারি বন্ধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। আশা করছি ঈদের আগে আরও ভালো ফল দিতে পারব।’
দেশব্যাপী ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে গত ২৬ জানুয়ারি ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ২২৪টি ট্রেনের টিকিট জব্দ করা হয়। তারা প্রতিদিন কালোবাজারির মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক টিকিট সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করত।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা রেলস্টেশনে কর্মরত অসাধু কর্মচারী, সহজ ডটকমের অসাধু কর্মকর্তা এবং সার্ভার রুম ও আইটি শাখার কর্মীদের সহযোগিতায় ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করত বলে জানিয়েছে র্যাব।
চক্রটির সদস্যরা রেলস্টেশনের কুলিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের টাকার লোভ দেখিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে। এ ছাড়া চক্রের সদস্যরা কাউন্টারে থাকা কিছু অসাধু টিকিট বুকিং কর্মচারীদের দিয়ে সাধারণ যাত্রীদের (টিকিট কাটার সময় দেওয়া) জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে রাখে। পরে এসব পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চারটি করে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করে।
টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১০ দিনে রেলওয়ের তিনজন বুকিং সহকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। টিকিট কাটার জন্য তারা কালোবাজারি ও দালালদের সরবরাহ করা অজ্ঞাতপরিচয় নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করত। এ ছাড়া স্টেশনের টিকিট কাটতে আসা যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও মোবাইল ফোন নম্বর ডায়েরিতে টুকে রাখত। তারপর সময় সুযোগমতো সেসব পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে টিকিট কেটে কালোবাজারিদের হাতে তুলে দিত।
২০২২ সালের জুলাই মাসে রেল খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার ওরফে রনির করা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় সহজ ডটকমকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কমলাপুর ও সবুজবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে সহজ ডটকমের কয়েকজন কর্মীসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মালিহা এম কাদির এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহাত আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
গত বছরের মাঝামাঝিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দল ছদ্মবেশে বিভিন্ন রুটের ট্রেনে অভিযান চালিয়ে টিকিট ছাড়া যাত্রীদের ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। অবৈধ এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও ট্রেনে খাবার সরবরাহে নিয়োজিত বেসরকারি ক্যাটারিংয়ের লোকজন জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায় দুদক।
এর আগে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১০টি দুর্নীতির খাত চিহ্নিত করে দুদক। এর মধ্যে দৃশ্যমান রেলের টিকিট কালোবাজারি অন্যতম।
যাত্রীদের সঙ্গে আলাপকালে এবং সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ট্রেনে ওঠার সময় কিংবা আসনবিহীন যাত্রীদের কাছে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ ও ক্যাটারিংয়ের লোকজন টিকিট আছে কি না জানতে চান। নাই বললে, তারা তখন অভয় দিয়ে বলেন, ‘সমস্যা নেই, আমরা দেখব।’ এরপর দরদাম করে তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়। আবার অনেক যাত্রী আছেন যারা এভাবে যাতায়াতে অভ্যস্ত তারা নিজেরাই তাদের সঙ্গে দরদাম ঠিক করে নেয়। যারা এসবের মধ্যে যান না তাদের জরিমানা করা হয়।
টিকিট কালোবাজারির পাশাপাশি জাল টিকিট বিক্রিরও প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক সময়ে। কম্পিউটারের দোকান থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার পর পিডিএফ কপি রেখে দেওয়া হয়। এ কপি এডিট (সম্পাদনা) করে নতুন আসন বসানো হয়। এমনকি কাউন্টার থেকে কাটা টিকিট স্ক্যান করে সম্পাদনার মাধ্যমে ইচ্ছেমতো আসনও বসানো হয়। এভাবেই ট্রেনের জাল টিকিট বিক্রির ডিজিটাল অপরাধী চক্র এখন সক্রিয়। এতে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। আবার অনেকেই রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের আর্থিক জরিমানা ও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হন।
কালোবাজারি চক্র এখন নতুন পদ্ধতি হিসেবে টিকিট রিফান্ড (ফেরত দিয়ে নতুন টিকিট সংগ্রহ) করে ফের টিকিট নিয়ে তা বিক্রি করছে। অর্থাৎ তারা আগেই টিকিট কেটে রাখে। এরপর যাত্রী জোগাড় করে কোনো এক ফাঁকে কাউন্টারে গিয়ে টিকিট রিফান্ড করেই সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর এনআইডি, নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে টিকিট করে দিচ্ছে। ফলে ট্রেনে যাত্রীর টিকিট পরীক্ষা করলেও তা যে কালোবাজারিদের কাছ থেকে কেনার তা আর ধরার উপায় থাকে না।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেনের মধ্যে বিনা টিকিটের যাত্রী শনাক্ত করতে সারা দেশে অন্তত ৫০০ জন ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) দরকার হলেও আছে মাত্র ২১৫ জন। এ ছাড়া স্টেশনে টিকিট চেক করার জন্য টিসির সংখ্যাও নগণ্য। এসব কারণেও সব যাত্রীর টিকিট যাচাই করা সম্ভব হয় না।
বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতি বছর কী পরিমাণ অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা যে ধারণা দিয়েছেন, তাতে এ অর্থের পরিমাণ বছরে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ কোটি টাকার মতো হবে। টিকিট ছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত মূল ভাড়ার চেয়ে কিছুটা কম টাকা ব্যয় হয়। সে হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। গত ১৪ বছরে রেলের উন্নয়নে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হলেও এখনো প্রতি বছর গড়ে লোকসান হচ্ছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
