টঙ্ক, নানকার ও তেভাগা আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠে ‘টঙ্কবিরোধী আন্দোলন’। এ আন্দোলনের অন্যতম মুখ কুমুদিনী হাজং। লড়াই করেছেন ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, কুমুদিনী হাজংকে কেন্দ্র করেই টঙ্কবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে স্ফুলিঙ্গের মতো। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৫০ সালে বাতিল হয় টঙ্কপ্রথা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একে একে বিদায় নিয়েছেন অগ্নিযুগের সেই সব বিপ্লবীরা। তাদের মধ্যে কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে ছিলেন কুমুদিনী হাজং। তিনিও এবার না ফেরার দেশে চলে গেলেন। গতকাল শনিবার নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলী গ্রামের বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। দুর্গাপুর কালচারাল একাডেমির পরিচালক সুজন হাজং এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কুমুদিনী হাজং বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন। তার স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে শেষকৃত্যের সময় নির্ধারণ করা হবে।
কুমুদিনী হাজংয়ের বয়স হয়েছিল ১০২ বছর। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জননী ছিলেন তিনি। কুমুদিনী হাজং ১৯২২ সালে বহেরাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অতিথ চন্দ্র রায় হাজং ছিলেন হাতিখেদা বিদ্রোহের কর্মী। জন্মের দুই বছরের মধ্যেই বাবা ও মা জনুমণি হাজং মারা যান।
এরপর কুমুদিনী হাজংয়ের ঠাঁই হয় তার এক মামার ঘরে। মামা চিরকুমার থাকায় কুমুদিনী হাজংকে ১১-১২ বছর বয়সে বহেরাতলীর মাইঝপাড়া গ্রামের দুর্গাদাস হাজংয়ের ছোট ছেলে লংকেশ্বর হাজংয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের পর স্বামী লংকেশ্বর তার পুরো পরিবার নিয়ে কুমুদিনীদের বাড়িতে চলে আসেন। টঙ্ক আন্দোলন শুরু হলে অন্যান্য হাজং পরিবারের মতো কুমুদিনীদের পরিবারও টঙ্কপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের সুসং জমিদারি এলাকায় টঙ্কপ্রথার প্রচলন ছিল। ফসল হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা হিসেবে জমিদারকে দিতে হবে। ১৯৩৭ সালে শোষিত কৃষকরা এ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন, যা টঙ্ক আন্দোলন নামে পরিচিত।
কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মনি সিংহের নেতৃত্বে এই আন্দোলনে কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী লংকেশ্বর হাজং সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি আন্দোলনকারীদের দমন করতে ব্রিটিশ সরকারের সশস্ত্র সেনারা লংকেশ্বরকে ধরতে তার বাড়িতে যায়। স্বামীর অবস্থান জানাতে না চাইলে সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নারী নেত্রী রাশিমনি হাজংয়ের নেতৃত্বে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ সেনাদের কাছ থেকে কুমুদিনী হাজংকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় সেনারা। এতে রাশিমনি হাজং, সুরেন্দ্র হাজংসহ বেশ কয়েকজন মারা যান। সেনারা কুমুদিনী হাজংকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। আন্দোলনের মুখে বাতিল হয় টঙ্কপ্রথা।
কমরেড মনি সিংহের ছেলে ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. দিবালোক সিংহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুমুদিনী হাজং শুধু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি। তিনি আদিবাসীদের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও সক্রিয় ছিলেন। তাদের অধিকার আদায়ে কথা বলেছেন। আমাদের চাওয়া তার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র উদ্যোগী হবে।
কুমুদিনী হাজংয়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এসব দলের নেতারা গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে শোক জানিয়ে বলেন, কুমুদিনী হাজং টঙ্ক আন্দোলনের একজন কিংবদন্তি নেতা ছিলেন। শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।
