ব্যবসায়ীর কারসাজি নেই

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০১:০৯ এএম

অনেকেই বলেন, ঈদ এলেই ব্যবসায়ীদের আচরণ বদলে যায়। তারা চশমখোর হয়ে ওঠে। সারা বছরের ক্ষতি কাটিয়ে রোজার এক মাসে জনগণের রক্ত চুষে তারা লাভবান হতে চায়। এর ফলে ঈদ আনন্দে অনেকের ভাটা পড়ে। কিন্তু এর শতভাগ দায় কি ব্যবসায়ীদের নাকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি? আবার এর সঙ্গে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামোর বিষয়টি। বাস্তবতা বিবেচনা করে আমাদের আসলে কী মনে হতে পারে? বিষয়টি আদৌ কি ঠিক? মনে হয়, প্রধানত এ ব্যাপারে দেশ-বিদেশের বাজার বিশ্লেষণ জরুরি। একইসঙ্গে প্রয়োজন, মুদ্রাস্ফীতির বিষয়টি মাথায় রাখা। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয় বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের। সেসব দ্রব্য রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সাধারণ নিয়মানুযায়ী মানুষকে নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কিনতে হয়। যে মূল্যের বিনিময়ে মানুষ কোনো দ্রব্য ক্রয় করে, সেই মূল্য মানুষকে আপন যোগ্যতায় উপার্জন করতে হয়। সে কারণে কোনো দ্রব্যের মূল্য যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তার দায় কি ব্যবসায়ী সমাজের? আমাদের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। অস্বাভাবিক ও আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে অপ্রত্যাশিত দুর্ভোগ ও অশান্তি। আমাদের দেশের প্রক্ষাপটে একদিকে একটি কথা ঠিক যে, কিছু ব্যাবসায়ী রয়েছেন যারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন! আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তারা তখনই জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। অথচ তারা এটা কিনেছিল আরও একমাস আগে! কিন্তু অধিকাংশ ব্যবসায়ী কিন্তু সহজে কোনো পণ্যের দাম বাড়ান না। এটা ঠিক এবার রমজানের এক/দেড় মাস আগে থেকেই কোনো কোনো ব্যবসায়ী পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছেন। যাতে রমজানে দাম বাড়ানোর জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে না হয়। এই ধরনের আচরণের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হতে পারে ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের লালসা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চাহিদা, মিথ্যার ধারাবাহিকতা বা সামাজিক কোনো অসংগতি। তবে, এই ধরনের আচরণ মূলত ব্যবসায়ীদের আর্থিক উদ্দীপনা থেকে সৃষ্টি হতে পারে। সমষ্টিগতভাবে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের এককভাবে দায়ী করা মোটেও সমীচীন হবে না। 

এক সময় দেশের বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। নিজে ফসল উৎপাদন করে ভোগ করতেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতো না কৃষক সমাজ। শুনেছি তারা নাকি লবণ আর কেরোসিন তেল ছাড়া আর কিছুই কিনতেন না। এখন সময় পাল্টে গেছে। গ্রামের মানুষ যারা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, বেশিরভাগ লোক শিক্ষিত হয়ে শহরে নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সৎ পথেই নগদ অর্থ উপার্জন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য কিনতে নগদ অর্থ নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন। বাজার মানেই ব্যবসায়ীদের কারবার। চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা এক জায়গার পণ্য আরেক জায়গায় নিয়ে যায়। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানি করে। ব্যবসায় আছে নানা স্তর। আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীরা তার মধ্যে এক স্তরের ব্যবসায়ী। পাইকারি বিক্রেতারা আর এক স্তরের। খুচরা বিক্রেতারা প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীদের সঙ্গেই ভোক্তাদের কায়কারবার। যিনি ভোক্তা তিনি উৎপাদন করেন না। এর মানে হচ্ছে- উৎপাদন, সরবরাহ, যাতায়াত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিজ দেশের সামাজিক কাঠামো। এর মধ্যে রয়েছে- বাজার ব্যবস্থাপনা, সরকারি পরিকল্পনা এবং কর্মকৌশল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সবকিছুর বাইরে যে বিষয়টি আসল, তা হলো- সরকারের সদিচ্ছা। এর মানে হচ্ছে, একটি দেশেকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সরকার পরিচালনা করতে চায়। কিন্তু কিছু জনগণ মনে করেন, বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্ত দায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর- যা শতভাগ বিভ্রান্তিকর এবং একপেশে। এটি আসলে মূল সমস্যা থেকে জনগণকে দূরে সরিয়ে রেখে, তাদের চিন্তা ও বিবেককে একপেশে করে রাখার কৌশল। যাতে কোনোদিনই আসল মুনাফাখোর চিহ্নিত না হতে পারে। এটা হলো, উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতোন। এটা ঠিক, দ্রব্যমূল্য প্রায়ই লাগামহীন হয়ে যায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা আমদানিকারক বা সরবরাহকারীদের দোহাই দিয়ে দ্রব্যমূল্যকে লাগামহীন করে রাখে। সবশেষে ভোক্তাকেই মেটাতে হয় উৎপাদনকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের লাভের অংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকট, ন্যায়সংগত ও নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ না করা, বাজার তদারকিতে অনীহাকে বাদ দিয়ে ঈদবাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে দোষারোপ করলে এবং তাদের ওপর জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুললে- কোনো পক্ষেরই লাভ নেই। বর্তমান বাস্তবতায় মানতে হবে- গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের সংকট কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বাজারে পড়েছে। এর ফলে পণ্যমূল্যের বিষয়টি স্থির রাখা অনেকাংশে কঠিন হয়ে পড়েছে। 

বর্তমানে বাংলাদেশে পণ্যের এত মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল, গ্যাস, খাদ্যপণ্য, কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে আমদানিকৃত পণ্যের দামও বেড়েছে। টাকার অবমূল্যায়ন, টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের দাম আরও বেশি বাড়ছে।

এটা ঠিক- শুধু দেশীয় বাণিজ্য নয়, বৈদেশিক বাণিজ্য বা আমদানি- রপ্তানির ক্ষেত্রেও ‘নৈতিকতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূলে থাকে উভয় দেশের স্বার্থ। এ স্বার্থ বিঘ্নিত হলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। নির্দিষ্ট কোনো পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে থাকা দেশগুলো ঐ পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোকে বিশেষ ছাড় দিয়ে সে পণ্য রপ্তানি করে। এতে বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই বিষয়টি রক্ষা করা খুবই জরুরি।

আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এমনিতেই মূল্যস্ফীতিতে অল্প পুঁজির ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত। এর ওপর সাধারণ ক্রেতারা কেনাকাটায় কৃচ্ছ্র সাধন করছেন। কিন্তু ঈদের মাসে, মজুদ পণ্যের চেয়ে চাহিদা বেশি থাকায়, পণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। অধিকাংশ মানুষের ঈদের সময় খরচের একটি বাজেট থাকে। কিন্তু চাহিদার তো কোনো বাজেট নেই। সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে একই পণ্যমূল্যে যখন সর্বস্তরের মানুষ কোনো পণ্য ক্রয়ের জন্য বাজারে যান- তখন একটা ভারসাম্যহীনতা  দেখা দেবেই। চাহিদা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার কারণে, সীমিত পণ্যের মধ্যে চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা হিমশিম খান। আর তখনই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এখানে ব্যবসায়ীর কোনো কারসাজি নেই। তবে কেউ যদি তা করে, তাহলে তা ব্যতিক্রম।

সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরাপদভাবে ব্যবসা পরিচালিত করতে হলে, মূল্যের এই পরিবর্তনের মৌলিক কারণ সম্পর্কে মনোনিবেশ করতে হবে। তখন দেখা যাবে,  ঈদবাজারে একটা ভারসাম্য আসবে। সব পেশার মানুষ তার সাধ্যের মধ্যে কোনো পণ্য তখনই ক্রয় করতে পারবেন- যখন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মধ্যে একটা ভারসাম্য আসবে। বিষয়টি অর্থনৈতিক হলেও, মূলত তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। এর বাইরে যে বিষয়গুলো রয়েছে, তা শতভাগ নির্ভর করে সরকারের ওপর। ঈদবাজারে স্বস্তি, আনন্দ এবং সহজপ্রাপ্তির বিষয়টি তখনই নিশ্চিত হবে, যখন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাণিজ্য কৌশল সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে তৈরি হবে। না হলে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকবেই। এটা রোধ করতে হলে, সবাইকে একটি দেশপ্রেমিক বোধ এবং চিন্তার মধ্যে থাকতে হবে। সবকিছু বাদ দিয়ে অন্ধভাবে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করলে, সমস্যার সমাধান হবে না। যেভাবে ঈদবাজার চলছে, সেরকমই থাকবে। পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন তো হবেই না, ক্রেতার কাক্সিক্ষত পণ্যমূল্য তো দূরের কথা। তবুও বলি, ঈদবাজার পরিস্থিতি থাকুক সমস্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই। চিহ্নিত হোক, প্রকৃত মুনাফাখোর।  

লেখক: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত