দেশে গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্যের হার কমলেও শহর এলাকায় বেড়েছে। কভিড মহামারীর পর দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার সামান্য কমে ২০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। কভিডের আগে, ২০১৮ সালে এই হার ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে দারিদ্র্যের হার দেশের গ্রামীণ এলাকায় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ২০১৮ সালে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ২১ দশমিক ৬ শতাংশে কমে এলেও শহুরে দারিদ্র্যের হার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই গবেষণায় আরও জানা গেছে, যৌথ গ্রামীণ এলাকায় চরম দারিদ্র্যে রয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। দারিদ্র্যের হারে শীর্ষে রংপুর, দ্বিতীয়তে বরিশালে। ‘কভিড-১৯ মহামারী এবং মহামারী-পরবর্তী প্রতিবন্ধকতা কীভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, শিক্ষা এবং খাদ্য-সুরক্ষার ওপর প্রভাব ফেলছে?’- শীর্ষক এ যৌথ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০২৩ সাল শেষে মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দেশের সাধারণ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কম খাচ্ছে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বেড়েছে তিনগুণ।
গবেষণায় কভিড মহামারীর কারণে জীবিকা হারানোর চিত্রও ফুটে উঠেছে। মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ওপর মহামারীর প্রভাবের ক্ষেত্রে এ গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৪ শতাংশ নারী মহামারী চলাকালে তাদের চাকরি হারিয়েছিলেন। অকৃষি খাতের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি স্বনিযুক্ত কর্মী মহামারী চলাকালে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অর্ধেকেরও বেশি স্বনিযুক্ত কর্মীকে এক-তিন মাসের জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। গবেষণায় অভিবাসী পরিবারের ওপর মহামারীর প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। মহামারীর শুরু থেকে অনেক আন্তর্জাতিক অভিবাসী শ্রমিককে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়েছে। ২০১৮ সালে অভিবাসী কর্মীদের সংখ্যার অনুপাত হিসাবে, জাতীয়ভাবে ২০২৩ সালে জরিপ চলাকালে আন্তর্জাতিক অভিবাসী পরিবারের ৯ শতাংশেরও বেশি পরিবারে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসী কর্মী ছিল। এ প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসীদের ফিরে আসার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মহামারী চলাকালে চাকরি হারানো (৩৩ শতাংশ), চুক্তিসংক্রান্ত সমস্যা (২০ শতাংশ), নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ (১৪ দশমিক ৭ শতাংশ), মিথ্যা/ভিসা বা প্রতারণার শিকার হওয়া (৪ শতাংশ)। সমীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা প্রতিবেদনে পাঁচটি মূল নীতিমালা সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারকে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস) অনুযায়ী সারা দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনুপস্থিত শিশুদের সমস্যা সমাধানের জন্য, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার কমাতে এবং মহামারী চলাকালে প্রতিবন্ধকতাঘটিত শিক্ষা-ক্ষতি (লার্নিং লস) পুষিয়ে নিতে শিক্ষা খাতে আরও বাজেট বাড়ানো। শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো। ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার কমাতে সক্রিয় শ্রমবাজার নীতি গ্রহণ। পরিশেষে, অত্যাবশ্যকীয় খাবারের (যেমন দুগ্ধজাত খাবার, মাংস, ফলমূল ইত্যাদি) বর্ধিত সরবরাহ। এর সঙ্গে সঙ্গে সহায়ক রাজস্ব ও আর্থিক নীতিমালা পরিপূরক হিসেবে জোরদার করা উচিত। অচিরেই এইসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করে কভিডের কারণে দরিদ্র মানুষের ওপর নেমে আসা ক্ষতি কমিয়ে আনা জরুরি।
