সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) নির্বাচনে সভাপতি পদে বিজয়ী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের দায়িত্ব নেওয়া না নেওয়া ইস্যুতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে চলছে তোলপাড়। এটি দলীয় সিদ্ধান্ত কি না, এ নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। এ ইস্যুতে কার্যত বিএনপিসমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের আভাস মিলেছে; যা শুরু হয়েছিল দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলার শুনানিকে কেন্দ্র করে। এরপর সময়ে সময়ে এটি কখনো প্রকাশ্যে এসেছে, কখনো রয়ে গেছে অপ্রকাশ্যে।
গত ৬ ও ৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ৯ মার্চ ঘোষিত ফলে সভাপতি ও কার্যনির্বাহী কমিটির তিনটি সদস্যপদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের প্যানেল ‘নীল দলের’ প্রার্থীরা জয়ী হন। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ করেন সরকারবিরোধী আইনজীবীরা। নির্বাচনে মারামারিকে কেন্দ্র করে নীল দলের সম্পাদক প্রার্থী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ বিএনপিপন্থি বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় গত বুধবার জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী এবং ফোরামের মহাসচিব ও দলের আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ব্যারিস্টার খোকনসহ সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে জয়ী ফোরামের চারজনকে দায়িত্ব গ্রহণে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ব্যারিস্টার খোকন এ সিদ্ধান্তের পেছনে সংগঠনের একজন ‘প্রভাবশালী ও রহস্যময়’ আইনজীবী নেতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নাম না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই নেতা সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের ‘ওয়াকওভার’ দিতে চেয়েছিলেন। ফোরামের সহসভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব।
আইনজীবী ফোরামের এ সিদ্ধান্তের কারণ জানতে সংগঠনের অন্তত পাঁচজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। একাধিক আইনজীবী বলেন, সভাপতির পদে দায়িত্ব গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তটি বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছে। তবে এ নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কেউ কেউ বলছেন, এটি দলীয় সিদ্ধান্ত কি না তা তারা জানেন না।
জানা গেছে, গত ২৪ মার্চ রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক করেন ফোরামের নেতারা। এতে এ জে মোহাম্মদ আলী, কায়সার কামাল, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং নির্বাচনে সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সভাপতির পদ গ্রহণ না করার বিষয়ে জোরালো মতামত দেন এ জে মোহাম্মদ আলী, কায়সার কামাল ও রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাদের যুক্তি ছিল, এ সরকারের অধীনে কোনো জাতীয়, স্থানীয় এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বার ও ঢাকা বারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণ সমীচীন হবে না। তবে জয়নুল আবেদীনসহ একাধিক শীর্ষ আইনজীবী দায়িত্ব গ্রহণের পক্ষে মৌন সম্মতি ও যুক্তি তুলে ধরে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তারপরও আইনজীবীদের একটি বৃহৎ পরিসরের সংগঠনে সভাপতির পদটি গুরুত্বপূর্ণ। পদটিতে যেহেতু মাহবুব উদ্দিন খোকন বিজয়ী হয়েছেন, সেজন্য আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব গ্রহণ করাই সমীচীন। তবে আলোচনা সাপেক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তটি টিকে যায়।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিঠির বিষয়টি আমি শুনেছি। কী পরিবেশে ও পরিস্থিতিতে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে তা জানি না। কথা হচ্ছে, একটা নির্বাচন হয়েছে। তাতে কারচুপি হয়েছে। এরপরও আমাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এখন কী কারণে দায়িত্ব নিতে বারণ করা হয়েছে সেটা ওনারাই বলতে পারবেন।’
বৈঠকের বরাতে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের ডাকার কোনো প্রয়োজন নেই। নির্বাচিত যারা হয়েছেন তারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন কি না, সেটা বড় ব্যাপার। এখন কী পরিপ্রেক্ষিতে, এটা দলের সিদ্ধান্ত কি না, তা তো আমি জানি না। যদি দলীয় সিদ্ধান্ত হয় তাহলে তো তাদের মানতে হবে।’ তবে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।
ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট বার ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি এসেছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে। তিনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) নিজেও বিএনপির একজন সিনিয়র ও দায়িত্বশীল নেতা। এখন মানা না মানা তার বিষয়। যদি দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে দলের ও ফোরামের বৈঠকে বিষয়টি নিশ্চয়ই উঠবে।’
ফোরামের মহাসচিব কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি দলীয় সিদ্ধান্ত। আমাদের কারও একার সিদ্ধান্ত নয়। আমরা শুধু সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাদের জানিয়েছি।’ একজন ‘প্রভাবশালী আইনজীবী নেতা’র বিষয়ে ব্যারিস্টার খোকনের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনি কেন এমন বললেন সেটি একান্তই তার বিষয়। কোন সে নেতা তার নাম তিনি বলুন। এর বাইরে আপাতত এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
ফোরামের সিদ্ধান্ত না মানলে ব্যারিস্টার খোকনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এ প্রশ্নে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘যদি কিন্তুর ওপর কোনো কথা বলা যায় না। এটা পরে দেখা যাবে।’
জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনের পর গত ৯ মার্চ ভোট গণনার দিন ফোরামের শীর্ষ নেতারা জরুরি বৈঠক করে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট গণনা কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণা দেন। তবে মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। কারণ হিসেবে তার ঘনিষ্ঠ একজন আইনজীবী বলেন, তিনি নির্বাচনের শুরু থেকেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। যে কারণে ভোট গণনা বর্জন বা পুনর্নির্বাচনের দাবির পক্ষে তার অবস্থান ছিল মৃদু। এমনকি ভোট গণনার সময় ফোরামের সিদ্ধান্তের বাইরে তিনি তার এজেন্ট ও অনুসারীদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রে ছিলেন। তবে ব্যারিস্টার খোকনের এমন মনোভাব বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের অনেকেই ভালোভাবে নেননি। যদিও রাতে ভোট গণনায় তার বিজয়ের আভাসের পরও ফোরামের আইনজীবীদের সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন ব্যারিস্টার খোকন। এমনকি গত বুধবারের ওই সিদ্ধান্তের পরও তিনি পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলছেন। এখন এ দাবি টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই তা ধরে নিয়েই তিনি বার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত বুধবার এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিক গেজেট এখনো হয়নি। এখন পুনর্নির্বাচন যদি না হয় তাহলেও তো আমি সভাপতি। এটা তো (দায়িত্ব পালন) অটোমেটিক (স্বয়ংক্রিয়ভাবে) হয়ে যাবে।’
