পাকা ভবনে হাত পড়েনি কাঁচা ঘর ভেঙে খনন

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৪, ০৮:২৪ এএম

অনুসরণ হচ্ছে না নকশা, এস্টিমেট ও অ্যালাইনমেন্টও। উচ্ছেদ হয়নি নদীর মধ্যে থাকা এক-দোতলা ভবনও। কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে চলছে খনন। আশ্রয় হারিয়ে বাসিন্দারা ঠাঁই নিয়েছেন বেড়িবাঁধে। খনন করা মাটি ফেলা হচ্ছে ফলন্ত ধানক্ষেতে। খুলনার ডুমুরিয়া তালতলা নদী খননের চিত্র এটি।

এ ছাড়া কুলবাড়িয়া খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অল্প পরিমাণ মাটি তুলে পাড় উঁচু করে দেখানো হচ্ছে গভীরতা।

১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে খনন করা হচ্ছে তালতলা নদী ও কুলবাড়িয়া খাল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে এ দায়সারা খনন প্রকৃতপক্ষে কাজে আসবে না। শুধুই অর্থের অপচয় হচ্ছে। প্রকল্পের সুফল নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় তালতলা নদীটি খনন হচ্ছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার খননে খরচ হবে ১১ কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ কাজের কার্যাদেশ পেয়েছে এএসডিজিএল-এমকেই (জেভি) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সালের ৩০ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত। প্রাক্কলন অনুযায়ী, নদীটির মুখে চওড়া হবে ৩০ মিটার, তলদেশ চওড়া হবে ১৫ মিটার এবং গভীরতা হবে ৪ মিটার। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র তিন মাস। অথচ কাজে বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ।

সুন্দরবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা বরুণ দেশ রূপান্তরকে জানান, খননে নকশাসহ কিছুই সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ভরাট হয়ে যাওয়া নদীর পশ্চিমপাড় দখল করে দুটি দোতলা ও চার-পাঁচটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো অক্ষত রাখতে একপাশে চেপে খনন করে দুই পাড় উঁচু করা হচ্ছে। অথচ ভেঙে ফেলা হয়েছে গরিব মানুষের কাঁচা ঘরগুলো। তারা এখন বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছেন। তাছাড়া ভাটামালিকদের কাছেও মাটি বিক্রি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাব্য হারিয়ে কুলবাড়িয়া খাল (গ্যাংরাইল নদী) ও তালতলা নদী ভরাটের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে গড়ে তুলেছেন একতলা-দোতলা বাড়ি। নদীর বুকে অনেক স্থানে করা হয় চাষাবাদও। এমন বাস্তবতায় পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার শিকার হয় মানুষ। বিশেষ করে নদীসংলগ্ন খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার অন্তত ৩০ গ্রামের মানুষকে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার ফসল।

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সেচ ও মাছের আধার তৈরিতে দেশের ৬৪ জেলায় অভ্যন্তরে ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় ডুমুরিয়া উপজেলায় কুলবাড়িয়া খাল খনন করা হচ্ছে। ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে সাড়ে ৬ কিলোমিটার জুড়ে খনন হবে এ খাল। প্রাক্কলন অনুযায়ী, খালের মুখ চওড়া হবে ১৫ মিটার, তলদেশের চওড়া হবে ১০ মিটার এবং গভীরতা হবে ২ মিটার। কাজটি করছে কুষ্টিয়ার ঠিকাদার মো. নাছির উদ্দিন মোল্যা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট ২০২৩ সালের ৩০ মে পর্যন্ত। কিন্তু প্রথম দফায় কাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে এ মেয়াদেও কাজ শেষ হয়নি। বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ।

কুলবাড়িয়ার বাসিন্দা বিকাশ জোয়াদ্দার ও রামপ্রসাদ দেশ রূপান্তরকে জানান, খালটিতে গভীর ঠিকমতো করা হচ্ছে না। অল্প মাটি খনন করে দুইপাড়ে রেখে উঁচু করে গভীরতা দেখানো হচ্ছে। খননের পরও খালে হাঁটুসমান পেঁড়িমাটি থেকে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢালু কম হচ্ছে, দুইপাড়ে আলগা মাটি রাখা হচ্ছে। এতে মাটি ধসে ফের খালে পড়ছে। সামনে বর্ষা মৌসুমে আরও ধসে পড়বে। ফলে এমন দায়সারা খননকাজে আসবে না। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসেই ফের ভরাট হয়ে যাবে।

জয়ন্ত মন্ডল ও মো. লিটন শেখ নামে অন্য দুই বাসিন্দা বলেন, কুলবাড়িয়া স্লুইসগেট থেকে নিচুখালি পর্যন্ত সরকারি ইটের রাস্তা। যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন কয়েক গ্রামের অন্তত পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার মানুষ যাতায়াত করে। কিন্তু মাটি কেটে রাস্তা পুরো ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ফলে মানুষ হেঁটেও চলাচল করতে পারছে না। তারা জানান, মাটি কেটে জমিতে ফেলে থোড় আসা বিঘা বিঘা ধান ধানক্ষেত নষ্ট করছে।

জানতে চাইলে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহমান তাযফিয়া বলেন, স্থানীয় মানুষ তাদের কাছেও নানা অভিযোগ করছে। কিন্তু বাস্তবে এস্টিমেট (প্রাক্কলন) অনুযায়ী খনন করা সম্ভব হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে খননের আগে ও খননের পরে মাটি পরিমাপ করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ হবে। ধসে পড়া মাটি ফের কেটে ওঠানো হবে এমন দাবি করেন তিনি।

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, ফসল নষ্ট করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আইন অনুযায়ী রেকর্ডীয় জমি নদীতে চলে গেলে তা খাস হয়ে যায়। সেই হিসেবে সেখানে মাটি রাখা হচ্ছে। রাস্তায় মাটি রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, রাস্তায় মাটি রাখায় জনসাধারণের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। তবে পরে মাটি সমান করে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করা হবে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে ফের ইট বসানো সম্ভব না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত