সাফ ফুটবলজয়ী ইয়ারজানের কুঁড়েঘর পাকা হচ্ছে

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০২:৫১ এএম

কিশোরী ইয়ারজান বেগম। দেশে নারী ক্রীড়াঙ্গনে এখন আলোচিত এক নাম। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে বিজয় ছিনিয়ে আনার মূল কারিগর এই ইয়ারজান বেগম। বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি গ্রামে। ভাঙাচোরা ঝুপড়ি ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন ইয়ারজান।

খুদে এই ফুটবলকন্যার সাফল্যের খবরে তার বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবারের করুণ অবস্থা দেখে অনেকেই সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতাও করেন। অনেকের মতো পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলামও ইয়ারজানের বাড়ি পরিদর্শনে যান। তিনি তাদের একটি বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইয়ারজানের বাড়িতে শুরু হয়েছে সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ। দুই কক্ষের ওই বাড়িতে থাকবে টয়লেট ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ বিদ্যুৎ সংযোগ। এতে খরচ হবে প্রায় চার লাখ টাকা। আগামী এক মাসের মধ্যে ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন।

সম্প্রতি ইয়ারজানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক শ্বাসকষ্টের রোগী। চলাফেরা করতে পারলেও কোনো কাজ করতে পারেন না। মা রেনু বেগমই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অন্যের বাড়ি এবং ক্ষেতখামারে কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়েই চলে দুই মেয়েসহ চারজনের সংসার।

হতদরিদ্র পরিবারের এই ইয়ারজানের অসাধারণ নৈপুণ্যে ভারতের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয় পায় বাংলাদেশ। ওই জয়ের পর থেকেই দেশের ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গে আনন্দে ভাসছে ইয়ারজানের পরিবারসহ এলাকার মানুষ। তার পারিবারিক অবস্থা তুলে ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকে আসছেন বাস্তব অবস্থা দেখতে। চেষ্টা করছেন সাধ্যমতো সহযোগিতার। ইতিমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, সদর উপজেলা প্রশাসন এবং র‌্যাব-১৩-এর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তা দিয়েই চলছে তাদের সংসার।

ইয়ারজানের বাবা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি শ্বাসকষ্টের রোগী। দুবার টিবির চিকিৎসা নিয়েছি। কোনো কাজ করতে পারি না। ইয়ারজানের মায়ের সামান্য আয় দিয়েই আমাদের খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও পাইনি। মেয়েকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারিনি। আর আমার ডানপিটে সেই মেয়েই কপাল খুলে দিয়েছে।’

মা রেনু বেগম বলেন, ‘খেলার জন্য আমার ইয়ারজানকে কত মারপিট করেছি। অনেক বকাবকি করতাম, ভয় দেখাতাম। খেলতে যেতে নিষেধ করতাম। কিন্তু সে লুকিয়ে চলে যেত খেলতে। পরে যখন বুঝলাম সে ভালো খেলতেছে, তখন আর গালি দিতাম না। এখন সে বিদেশের মাটিতেও খেলে ভালো করেছে। আমরা খুব খুশি হয়েছি। আমাদের মতো এলাকার সবাই খুশি। ডিসি স্যার আমাদের বাড়ি করে দিচ্ছেন। আমার মেয়ে এখন ঢাকায়। সে যখন বাড়ি আসবে, দেখবে আমাদের আগের বাড়ি আর নেই। আমরা বসবাস করছি পাকা বাড়িতে। সে যে কী আনন্দ পাবে তা বলে বোঝাতে পারব না।’

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়ারজান সম্পর্কে আগে জানতাম না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পেরে ছুটে যাই তার বাড়িতে। বাড়ির অবস্থা দেখে তাৎক্ষণিক একটি থাকার মতো বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার ঘোষণা দিই। আশা করছি ঈদের আগেই নির্মাণকাজ শেষ হবে।’

পঞ্চগড়ের চার খেলোয়াড়কে সংবর্ধনা : সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন ওই দলের সদস্য ইয়ারজানসহ পঞ্চগড়ের চার নারী ফুটবলারকে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল শনিবার সকালে দীর্ঘদিন পর পঞ্চগড় ফেরেন ইয়ারজান। এদিন স্থানীয় টুকু ফুটবল একাডেমি থেকে শিক্ষা নেওয়া ইয়ারজানকে ফুলেল সংবর্ধনা দেন টুকু ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড়রা। ইয়ারজানের সাফল্যে আনন্দে আপ্লুত তারা। শহরের রৌশনাবাগে টুকু ফুটবল একাডেমি কার্যালয়ে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরে একটি পিকআপ ভ্যানে ইয়ারজানকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরে বেড়ানো হয়। এ সময় বাবা আবদুর রাজ্জাক ও দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষক আবু তারেক টুকু ছিলেন সঙ্গে। ইয়ারজানকে নিয়ে সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি গ্রামে তার নিজের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ফুলেল সংবর্ধনা পেয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইয়ারজান বলেন, ‘কাঠমান্ডুর সেই মাঠে বাবা আর আমার প্রশিক্ষক টুকু স্যারকে খুব মনে পড়ছিল। বলগুলো যখন ঠেকাচ্ছিলাম তখন দেশের কথা, বাবার কথা, টুকু ফুটবল একাডেমির কথা বারবার মনে পড়ছিল। বাবা আর কোচ সেখানে থাকলে আরও খুশি হতাম। সেদিন আমি খুব কান্না করেছি। খেলার জন্য কত লোকে কত কী বলেছে। টিটকারি করেছে। খারাপ বলেছে। কিন্তু আমার বাবা আর কোচ আমাকে সাহস দিয়েছেন।’

ইয়ারজানের বাবা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘মানুষ আমার মেয়েটাকে ছেলে ছেলে বলে টিটকারি করত। বলত এই মেয়ের বিয়ে হবে না। আমি কৃতজ্ঞ। আমি আমার মেয়ের জন্য সবার দোয়া চাই।’

এদিকে একই দিন বিকেলে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য পঞ্চগড়ের আরও তিন নারী ফুটবলার আলপী, তৃষ্ণা এবং মিতুকে ফুলেল সংবর্ধনা দিয়েছে বোদা ফুটবল একাডেমি। বোদা পাথরাজ কলেজমাঠে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত